হরমুজ মাইনমুক্ত করার মার্কিন দাবির সত্যতা কতোটুকু?

অনলাইন ডেস্ক

নৌবাহিনীর ডুবুরি ও আন্ডারওয়াটার ড্রোন দিয়ে হরমুজ প্রণালিকে মাইন মুক্ত করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে ইরান আন্তর্জাতিক ও ওমানি জলসীমার তলদেশে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মাইন স্থাপন করেছে বলে দাবি করে। তবে চার মাস ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চালানো এক গোপন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সেই পাতানো মাইনগুলো অপসারণ করার দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম। ফাইনান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আমেরিকান নেভি সিল ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ছোট ছোট দল রাতের আঁধারে মূল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত, যাতে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই সমুদ্রপথটির নিরাপত্তাকে পূর্ণমাত্রায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আমেরিকা আধুনিক প্রযুক্তির রোবোটিক বোট ও অত্যন্ত সূক্ষ্ম হাই-রেজুলেশন সোনার ড্রোন ব্যবহার করে সাগরের তলদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্ক্যান করেছে। কোনো স্থানে মাইনের অস্তিত্ব কিংবা সন্দেহজনক বস্তুর সন্ধান পেলেই মার্কিন ডুবুরিরা বিশেষ ইনফ্ল্যাটেবল নৌকার সাহায্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাত এবং বস্তুর গায়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক স্থাপন করে তা ধ্বংস করে দিত। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক রোবোটিক ড্রোন পাঠিয়েও পানির নিচ থেকে সরাসরি এসব মাইন ধ্বংস করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, গত জুন মাস নাগাদ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে প্রায় ৮০টির মতো মাইন স্থাপন করা হয়েছিল। এপ্রিল মাসেই প্রথম আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তাদের সেন্ট্রাল কমান্ড আধুনিক পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে বাণিজ্য জাহাজের জন্য বিকল্প নতুন নিরাপদ পথ উন্মুক্ত করবে।

যদিও আমেরিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওমানের নিকটবর্তী দক্ষিণ প্রণালি এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ, তবে গোটা হরমুজ প্রণালি ইরান মুক্ত কি না তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা থেকে গেছে। তেহরানও একে কেন্দ্র করে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সমস্ত মাইনের সঠিক অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য শুধু তাদের কাছেই আছে। গত আগস্টের শেষ দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করে, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহারের সময় একটি সুপারট্যাঙ্কার তাদের দুটি নৌ-মাইনের সাথে ধাক্কা খেয়ে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর উত্তরে আমেরিকান বাহিনী ইরানের লারাক দ্বীপে রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় হামলা চালিয়ে মাইনের নতুন চালানের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং বারবার সতর্ক করেছে যে হরমুজ জলসীমায় নতুন করে মাইন রাখার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোর সামরিক শক্তিতে দমন করা হবে।

আমেরিকা বর্তমানে দ্বিমুখী সামরিক কৌশল গ্রহণ করেছে। একদিকে ডুবুরি, ড্রোন ও সেন্টকমের সার্বিক সামরিক পাহাড়ায় ওমানি করিডোর সাধারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে, আর অন্যদিকে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হচ্ছে যাতে ইরানের তেল বাণিজ্যের নিজস্ব সামুদ্রিক করিডোর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সম্প্রতি তেহরানের পক্ষ থেকে আমেরিকান যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন বাহিনী সরাসরি তিনটি ইরানি তেল সুপারট্যাঙ্কারে বিমান হামলা চালিয়ে দুটি সম্পূর্ণ অকেজো এবং একটিকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে ইরানি তেলের বাণিজ্য বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে নৌপথে মাইনের চূড়ান্ত অপসারণের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে জাহাজের বীমা বাবদ আকাশচুম্বী খরচ বৃদ্ধি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা আশঙ্কা কমানো।

সূত্র: গালফ নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights