হামাসের সঙ্গে ‘সম্পর্কের দায়ে’ কী ৭ ত্রাণকর্মীকে হত্যা করে ইসরায়েল?

অনলাইন ডেস্ক

গাজায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) ত্রাণবহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সাতজন ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতির আওতায় হামলার শিকার ত্রাণকর্মীদের ‘সম্পর্কের ভিত্তিতে দায়ী’ বা সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক প্রসিকিউটর ২০২৪ সালের এপ্রিলের ওই হামলায় কোনো ফৌজদারি মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত জানান। ওই ঘটনায় ডব্লিউসিকের স্পষ্ট চিহ্নযুক্ত তিনটি গাড়িতে ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে তিন ব্রিটিশ ত্রাণকর্মী, একজন অস্ট্রেলীয়, একজন ফিলিস্তিনি, একজন পোলিশ এবং দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক নিহত হন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ঘটনাটিকে কয়েকজন কর্মকর্তার করা নির্দিষ্ট ভুলের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। একই সঙ্গে নিহত ত্রাণকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তারা খাদ্য সহায়তার বহর রক্ষায় সশস্ত্র প্রহরী নিয়োগ করেছিলেন এবং অনুমোদিত পথ থেকে ‘বিচ্যুত’ হয়েছিলেন। তবে দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ব্যাখ্যায় ত্রাণকর্মীদের হত্যায় ব্যবহৃত একটি প্রচলিত সামরিক পদ্ধতির ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

ঘটনার সময় হামলার নির্দেশ দেওয়া রিজার্ভ কর্নেল নোচি মেন্ডেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ডব্লিউসিকের কর্মীরা কয়েক মিনিটের জন্য এমন কিছু সশস্ত্র ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন, যাদের হামাসের সদস্য বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। মেন্ডেল বলেন, ত্রাণকর্মীদের ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে ‘মিশে থাকা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তার ব্যাখ্যায়, কাছে থাকা, কথা বলা কিংবা সময় কাটানোর মতো বিষয়ও এই ‘মিশে থাকা’র মধ্যে পড়ত।

মেন্ডেল যে নীতির কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে ‘হাফালালা’ নামে পরিচিত। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এটিকে ‘অপরাধে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা’ বা ‘incrimination’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই নীতির আওতায় মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা কাউকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা পান। এমনকি কারও সঙ্গে সম্পর্ক বা অবস্থানের ভিত্তিতেও কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেন্ডেলের দাবি, গাজায় হামাসের সহায়তা দখল বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ঠেকানোও তাদের সামরিক মিশনের অংশ ছিল। ডব্লিউসিকের গাড়িবহরে হামলার সময় তাদের কাছে থাকা সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতিকে সেই ‘প্যাটার্ন’-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা, যিনি ঘটনাটির সঙ্গে পরিচিত, বলেন—গাজায় কোনো সশস্ত্র ব্যক্তিকে হামাস বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল সাধারণ চর্চা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রের কাছাকাছি থাকা বা ত্রাণবাহী ট্রাকের আশপাশে চলাফেরার মতো বিষয়ও কাউকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করার কারণ হিসেবে বিবেচিত হতো।

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ডব্লিউসিকের গাড়িবহরটি ধ্বংস হওয়ার সময় সেখানে ইসরায়েলি সেনারা সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, হামলাটি ইসরায়েলি সেনাদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি মোকাবিলার জন্য নয়; বরং হামাসের ত্রাণ বিতরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ঠেকানোর সামরিক মিশনের অংশ হিসেবে চালানো হয়েছিল।

এদিকে ডব্লিউসিকে বলেছে, ওই হামলায় নিহতরা ছিলেন নিরস্ত্র এবং কারও জন্য হুমকি ছিলেন না। সংস্থাটির দাবি, হামলার সময় তাদের গাড়িগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল এবং ইসরায়েলি বাহিনী তাদের পরিচয়, চলাচল ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আগে থেকেই জানত। ইসরায়েলি সামরিক প্রসিকিউটরের ফৌজদারি মামলা না চালানোর সিদ্ধান্তকে তারা ‘গভীরভাবে আপত্তিকর’ বলে উল্লেখ করেছে।

হামলায় নিহত সাতজন হলেন—ব্রিটিশ নাগরিক জেমস কিরবি, জেমস হেন্ডারসন ও জন চ্যাপম্যান, অস্ট্রেলিয়ার জোমি ফ্র্যাঙ্ককম, ফিলিস্তিনি সাইফেদ্দিন আবুতাহা, পোল্যান্ডের দামিয়ান সোবোল এবং দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর উচ্চ হার নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে এই ধরনের টার্গেট নির্ধারণ পদ্ধতির সম্পর্ক রয়েছে। এর পাশাপাশি উচ্চ মাত্রার ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ গ্রহণ, বড় এলাকাকে ‘ফ্রি-ফায়ার জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ফিরে আসা ঠেকাতে এলাকাগুলো ধ্বংস করার মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রেখেছে বলে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদনের প্রকাশের তিন দিন পরও তারা কোনো জবাব দেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights