হামে শিশুমৃত্যু কেন থামছে না?
জয়শ্রী ভাদুড়ী
হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সাড়ে চার মাস পার হলেও থামছে না শিশু মৃত্যু। এ সময়েই হাম ও হামের উপসর্গ কেড়ে নিয়েছে ৮৩১ শিশুর প্রাণ। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে টিকা ক্যাম্পেইন চালালেও থামানো যাচ্ছে না সংক্রামক ব্যধি হামকে। পরিকল্পনার ঘাটতিতে টিকা ক্যাম্পেইনে অনেক শিশু বাদ পড়ায় হাম প্রতিরোধ হচ্ছে না বলে দাবি করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামে ৯৫ ভাগ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। প্রায় ৪০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার হিসাবেই ধরা হয়নি। তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কীভাবে? সাধারণত লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ করে টিকা দিলে ১৫-২০ দিনে হাম নিয়ন্ত্রণে আসার কথা। কিন্তু এখনো হামে শিশুর মৃত্যু ঘটছে, আক্রান্ত হচ্ছে। এটা হতাশাজনক। জাতীয় কর্মসূচিতে ভুল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় এত শিশুর মৃত্যু ঘটল।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে দুজনের, হামে মৃত্যু হয়েছে একজনের। এ নিয়ে গত মার্চ থেকে হামের উপসর্গে ৭৩৫ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়ে ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৪০ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৭৩৯ জনের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত, ২৯ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী চলমান হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৮৩ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পেইনে মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে জাতীয়ভাবে টিকাদানের কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৪ শতাংশ। প্রায় সব বিভাগেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ বা অতিক্রম করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কভারেজ অর্জন করেছে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ। যেখানে ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ২১৮ জনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৯২ জন। ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে কভারেজ হয়েছে ১০৪ শতাংশ। খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১০২ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে টিকাদান কভারেজ ১০১ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগে ১০০ শতাংশ টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে।
সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতেও টিকা দেওয়া হয়েছে। মোট ১৯ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে টিকা পেয়েছে ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৭২৯ জন। ফলে সিটি করপোরেশন এলাকায় সামগ্রিক কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৭ শতাংশ। বিশেষ করে গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে টিকাদান কভারেজ যথাক্রমে ১১৪ ও ১১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় দেশে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় টিকা দেওয়া হবে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি দেশের সব শিশুকে। ইপিআইয়ের হিসাবে দেশে এই বয়সি শিশু আছে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন। তবে ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে একই বয়সি শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের। এ ক্ষেত্রে ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। ভিটামিন ‘এ’ এবং হাম-রুবেলার ক্ষেত্রে একই বয়সি শিশুদের সংখ্যায় পার্থক্য ৪৬ লাখ। এই শিশুরা টিকা কর্মসূচির হিসাবেই নেই।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। মহামারি যেভাবে মোকাবিলা করা হয় সেভাবে কাজ করতে হবে। প্রাইমারি কেয়ার, সেকেন্ডারি এবং আইসিইউ এভাবে স্তরবিন্যাস করে সেবা দিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টির শিকার শিশুদের শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে। নয়তো দেখা যাচ্ছে, একদিকে টিকা দিচ্ছে আরেক দিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকা দেওয়ার জন্য মাইক্রোপ্ল্যানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় এই টিকা ক্যাম্পেইনে সরকার পরিকল্পনা করার সময় পায়নি। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ না করলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল।’
