হারাচ্ছে আলোর পোকা জোনাকি, ফেরানোর উপায় কি?

অনলাইন ডেস্ক
কখনও সন্ধ্যা নামলেই মাঠে, গাছতলায় কিংবা খোলা জলাভূমির ধারে জড়ো হতো শিশুর দল। তাদের হাতে ধরা পড়ত ছোট্ট একটি আলোর বিন্দু, নাম তার জোনাকি। সেই আলো ছিল নিখাদ বিস্ময়, ছিল রাতের সৌন্দর্য। কিন্তু সময় বদলেছে। শৈশবের সেই আলোর স্মৃতি এখন অতীত হয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে দ্রুত কমে যাচ্ছে জোনাকির সংখ্যা। আর এই বিলুপ্তির পেছনে আছে প্রধান তিনটি কারণ; বাসস্থান ধ্বংস, আলো দূষণ এবং কীটনাশকের ব্যবহার।

বিশ্বে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির জোনাকি রয়েছে। বেশিরভাগ জোনাকি পোকা জন্মায় এবং বেঁচে থাকে আর্দ্র পরিবেশে; পুকুরের ধারে, জলাভূমিতে, পচা কাঠের পাশে বা অন্ধকার বনে। কিন্তু উন্নয়ন আর নগরায়নের চাপ সেই পরিবেশকে গ্রাস করে নিচ্ছে। খোলা মাঠ ভরাট করে বহুতল ভবন, ম্যানগ্রোভ বনের জায়গায় কৃষিখামার, নদীর তীরে ইঞ্জিনচালিত নৌকা; সব মিলিয়ে জোনাকির জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকার এবং নীরব পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী সারা লুইসের নেতৃত্বে ২০২০ সালে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, জোনাকিদের টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশগত শর্ত প্রয়োজন। তার ভাষায়, জোনাকিদের জীবনচক্র এমন এক জায়গার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে এদের জন্ম হয়, তারা সাধারণত সেখানেই থাকে। বলেন গবেষক দলটির প্রধান। সেই পরিবেশ হারালে তারা প্রজনন করতে পারে না, প্রজন্ম জন্মায় না। আরেকটি বড় হুমকি কৃত্রিম আলো। জোনাকিরা তাদের দেহের আলো ব্যবহার করে সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং প্রজনন করে। পুরুষ জোনাকি আলো জ্বেলে উড়ে বেড়ায়, স্ত্রী জোনাকি অপেক্ষা করে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য। কিন্তু মানুষের রাস্তার লাইট, বিজ্ঞাপনের আলো, গাড়ির হেডলাইট; সব কৃত্রিম আলো জোনাকিদের নিজেদের সংকেত পাঠানো ব্যাহত করে। ফলে তারা সঙ্গী খুঁজে পায় না। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের অন্তত ২৩ শতাংশ এলাকায় রাতের অন্ধকার আর অন্ধকার থাকে না, এটা জোনাকিদের জন্য মৃত্যুঘণ্টা।

এদিকে কৃষিজমিতে ব্যবহার করা কীটনাশক জোনাকির লার্ভার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। লার্ভা সাধারণত এক থেকে দুই বছর বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু মাটির রাসায়নিক উপাদান তাদের বেড়ে ওঠার সময়ই ধ্বংস করে দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কীটনাশকের প্রভাবে জোনাকির মৃত্যুহার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ‘জোনাকি ট্যুরিজম’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নৌকায় করে নেওয়া হচ্ছে জোনাকির আবাসস্থলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পর্যটনে আলোর ব্যবহার, শব্দ এবং নৌকার ইঞ্জিন জোনাকিদের জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

তবে আশার কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো সময় আছে। সচেতনতা বাড়ানো গেলে জোনাকিকে রক্ষা করা সম্ভব। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে অপ্রয়োজনীয় আলো কমাতে হবে, কীটনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং জলাভূমি, বন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights