হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে দিল্লির অস্বস্তি

এম এ আজিজ
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার আবারও জানিয়েছেন। ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটনে সেন্টার ফর ইউএস-বাংলাদেশ রিলেশনস আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলেও দেশে ফিরবেন। তাঁর বক্তব্য পরদিন এনডিটিভিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে প্রত্যাবর্তনের যাত্রাপথ কিংবা দেশে ফিরে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার নতুন অবস্থান নয়। এর আগে ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতেও একই পরিকল্পনার কথা বলেন। অক্টোবরে পুনরায় অঙ্গীকার করায় তাঁর ঘোষণার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়েছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার আর বাস্তব প্রত্যাবর্তন এক বিষয় নয়।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে শেখ হাসিনা দেশে ফেরাকে রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার জন্য প্রত্যাবর্তন জরুরি। একই সঙ্গে তিনি দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। এগুলো থেকে বাংলাদেশ সরকার বা ভারতের সঙ্গে তাঁর কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।

প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি সম্পর্কে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এনডিটিভির ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার কথা জানালেও নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। সময় ঘনিয়ে এলে ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে জয় জানিয়েছেন। ফলে প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক ঘোষণা থাকলেও বাস্তব প্রস্তুতির সময়সূচি অনিশ্চিত। যাত্রার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং দেশে পৌঁছে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন, এসব প্রশ্নেরও এখনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন এবং তাঁকে আপাতত বাংলাদেশে না ফেরার পরামর্শ দিয়েছে-এমন দাবিও আলোচনায় এসেছে। একইভাবে দাবি করা হয়েছে, তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ বা ভারতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া কথিত গোপন আলোচনার বিবরণ নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও দুটি বিষয় এক নয়। তিনি দলটির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশে ফিরে রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার আগ্রহ জানিয়েছেন। কিন্তু দেশে ফিরলেই দলটির কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা, নেতৃত্বের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নির্ভর করবে বিদ্যমান আইনগত অবস্থা, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। জনগণের প্রতিক্রিয়াও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে অবস্থান নেন। তাঁর সরকারের পতনের পর আন্দোলন দমনে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এই রায় তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক ঘোষণার পাশাপাশি গুরুতর বিচারিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

শেখ হাসিনা রায় ও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বিচারিক কার্যক্রমকে আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে। এ দুই অবস্থান প্রতিবেদনে পৃথকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। অভিযোগ, আদালতের রায়, অভিযুক্তের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এক বিষয় নয়। বিশেষত অনুপস্থিতিতে দেওয়া রায় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মামলার প্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়কার প্রাণহানির মাত্রাও এই বিচারিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরের অনুসন্ধানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতায় সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৪০০ ব্যক্তি নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান আন্দোলন দমনসংক্রান্ত অভিযোগের মানবিক গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে সামগ্রিক প্রাণহানির হিসাব এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত দায়কে এক করে দেখা যায় না। ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।

দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে বিদ্যমান মামলা, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে পারে। তবে তাঁকে কখন গ্রেপ্তার করা হবে, কীভাবে আদালতে হাজির করা হবে কিংবা প্রত্যাবর্তনের পর ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা আগাম নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁর নিজের ঘোষণায় দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে; কিন্তু প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা নির্ভর করবে পরিস্থিতি ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর। কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা থাকলেও তা বিচারিক আদেশের স্বয়ংক্রিয় বিকল্প নয়।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থান প্রত্যাবর্তনের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ৩ অক্টোবর বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন অনুষ্ঠানে বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতীয় আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং বিষয়টির সঙ্গে আদালত যুক্ত। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের পরিকল্পনা ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে এখনো সমন্বিত নয়। প্রত্যাবর্তনের সময় তাই নিশ্চিত নয়।

ত্রিবেদী ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ভারতে পৌঁছানোর পরিস্থিতিও ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী হিসেবে শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করা ভারতের দায়িত্ব ছিল। ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী তাঁকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যায়নি; বাংলাদেশের সামরিক বিমানে তিনি ভারতে পৌঁছান। ভারত এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে এই ব্যাখ্যা ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।

বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখানে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা এবং প্রত্যর্পণের মাধ্যমে হস্তান্তরকে পৃথকভাবে দেখা জরুরি। শেখ হাসিনা নিজে ফিরে আদালতে হাজির হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত পদক্ষেপ হবে। অন্যদিকে প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে প্রযোজ্য আইন, দুই দেশের চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিস্তৃত স্বার্থ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণের অনিষ্পন্ন প্রশ্ন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করছে। ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিষয়টিকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিরক্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দুই দেশকে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান।

ওয়াশিংটন অবশ্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে বিষয়টির সমাধান খুঁজে নিক। এই অবস্থান থেকে কোনো পক্ষের প্রতি সমর্থন কিংবা প্রত্যর্পণের পক্ষে মার্কিন সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে উদ্বেগ প্রকাশ, সংলাপের আহ্বান এবং কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে তার প্রকৃত সীমার মধ্যেই ব্যাখ্যা করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে। তবে সফরসংক্রান্ত যোগাযোগ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ থাকলেও প্রত্যর্পণ একটি স্বতন্ত্র আইনি ও কূটনৈতিক বিষয়। কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করতে হলে সরকারি বক্তব্য, নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা প্রকাশিত নথি প্রয়োজন। সম্ভাবনা ও নিশ্চিত তথ্যের পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার তাই বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা। তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রকাশ। ভারতীয় হাইকমিশনার জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। ফলে ডিসেম্বরের ঘোষণা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।

♦ লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights