হেভি মেটাল বনাম অর্কেস্ট্রা: ধ্রুপদী দর্শনের নান্দনিক পরীক্ষা

অনলাইন ডেস্ক

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ ৩৮ দিনের রোমাঞ্চ আর ১০৩টি ম্যাচের লড়াইয়ের ধুলো উড়িয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল এখন দাঁড়িয়ে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে অংশ নেওয়া ৪৬টি দেশকে বিদায় করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে রয়েছে কেবল বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই দল। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় (ইউএস সময় বিকেল ৩টা) বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বসেরা দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে দেখা হচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক লড়াইয়ের মঞ্চ প্রস্তুত করেছে।

এবারের ফাইনালকে ফুটবল পণ্ডিতরা দেখছেন সম্পূর্ণ বিপরীত ধারার দুটি ফুটবল দর্শনের ধ্রুপদী লড়াই হিসেবে। সাবেক লিভারপুল ম্যানেজার য়ুর্গেন ক্লপের একটি বিখ্যাত উক্তি ধার করে বলা যায়, আজকের ম্যাচটি হতে যাচ্ছে আদতে ‘হেভি মেটাল মিউজিক’ বনাম এক সুরময় ‘অর্কেস্ট্রা’র যুদ্ধ। একদিকে আর্জেন্টিনা খেলছে তীব্র শারীরিক শক্তি, আগ্রাসন আর গতিময় ফুটবল। প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে নিজেদের চেনা ছন্দ থেকে বিচ্যুত করাই তাদের মূল শক্তি। মাঠের এই তুমুল কোলাহল আর শারীরিক লড়াইয়ের আড়ালেই তৈরি হয় লিওনেল মেসির জাদুকরী মুহূর্ত তৈরির পটভূমি। সতীর্থরা যখন মাঠের ‘কালো কাজ’ কিংবা রক্ষণের লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন, মেসি তখন নিজের ফুটবলীয় দূরদর্শিতা দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করার সুযোগ খোঁজেন। চলতি টুর্নামেন্টে একাধিক ম্যাচে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন আর অবিশ্বাস্য জয় আর্জেন্টিনার এই লড়াকু মানসিকতারই প্রমাণ দেয়।

অন্যদিকে স্পেন হেঁটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। ‘টিকি-টাকা’র চেনা ঐতিহ্য ধরে রেখে তারা প্রতিপক্ষকে বল পজিশনে বোকা বানাতে ভালোবাসে। স্প্যানিশদের মূল মন্ত্রই হলো, বল যতক্ষণ আমাদের পায়ে থাকবে, প্রতিপক্ষ ততক্ষণ গোল করতে পারবে না। মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি রদ্রি এবারও আছেন দুর্দান্ত ফর্মে, যিনি টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬৯৪টি নিখুঁত পাস দিয়ে দলের আক্রমণের সুর বেঁধে দিচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য থাকবে রদ্রিকে নিষ্ক্রিয় করা। আর তাই ম্যাচে ফাউল ও শারীরিক সংঘর্ষের ছড়াছড়ি দেখার সম্ভাবনা প্রবল, যা সামলাতে রেফারি স্লাভকো ভিনচিচকে চরম পরীক্ষা দিতে হবে।

কৌশলগত লড়াইয়ের পাশাপাশি এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে ফুটবলের বর্তমান ‘রাজা’ বনাম হবু ‘রাজপুত্রের’ দ্বৈরথ। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্ব শাসন করা লিওনেল মেসির সামনে আজ প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছেন স্পেনের উদীয়মান বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বার্সেলোনার হয়ে তিনটি লা লিগা এবং জাতীয় দলের হয়ে ইউরো জেতা ইয়ামালকে অনেকেই মেসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন। ২০০৭ সালের সেই বিখ্যাত ফটোশুটে যেখানে শিশু ইয়ামালকে স্নান করিয়েছিলেন তরুণ মেসি, আজ এত বছর পর সেই দুজনই একে অপরের মুখোমুখি হয়ে বৃত্তটি সম্পূর্ণ করতে যাচ্ছেন।

পরিসংখ্যানের পাতায় আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ জিতে ফাইনালে এলেও তাদের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। কেপ ভার্দে, মিশর ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য সব রূপকথা লিখে তারা ফাইনালে পা রেখেছে। পক্ষান্তরে, প্রথম ম্যাচে ড্র দিয়ে আসর শুরু করলেও সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে স্প্যানিশরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিয়েছে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১৯ গোল করা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের সামনে আজ পরীক্ষা স্পেনের টুর্নামেন্ট-সেরা রক্ষণভাগের, যারা পুরো আসরে গোল খেয়েছে মাত্র একটি।

তবে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের আমেজও এবার ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে। আমেরিকার ফুটবল উন্মাদনাকে রাঙিয়ে দিতে ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে থাকছে জমকালো হাফ-টাইম শো, যেখানে মঞ্চ কাঁপাবেন শাকিরা, ম্যাডোনা, জাস্টিন বিবার ও বিটিএস-এর মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা। প্রথাগত ১৫ মিনিটের বিরতির নিয়ম ভেঙে এই কনসার্টের কারণে বিরতির সময় কিছুটা বাড়তে পারে, যা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে মৃদু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। এছাড়াও ভিভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত থাকছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ম্যাচ শেষে ফিফা সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনোর সাথে যৌথভাবে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন বলে কথা রয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights