১০০ ব্যক্তির হিসাব জব্দের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে অর্থায়নের অভিযোগ তদন্তে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে প্রায় ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। তালিকায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপের মালিক, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্র জানায়, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে এনবিআরের দুটি গোয়েন্দা ইউনিট। তালিকায় মণ্ডল, এনভয়, গিভেন্সি, স্ট্যান্ডার্ড, নিপা, ওয়েল ও তুসুকা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সুতা, কাপড়ের রং, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এ তালিকায়। এর মধ্যে মণ্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মণ্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড (বিডি), কটন ক্লাব (বিডি), কটন ক্লোদিং (বিডি), মণ্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মণ্ডল স্পিনিং মিলস, মণ্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং, আলিম নিট, মণ্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, মণ্ডল নিট কম্পোজিট, মণ্ডল নিটওয়্যারস ও মণ্ডল ইয়ার্ন ডাইং। এ ছাড়া পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও, মণ্ডল অ্যান্ড কোম্পানি ও মনটেক্স ফেব্রিকসের নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তালিকায় আবদুল আলিম মণ্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মণ্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, আবদুল মান্নান মণ্ডল, মোমেনা খাতুন, আবদুল মোমিন মণ্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল মজিদ মণ্ডলের নাম রয়েছে।

এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান-এনভয় গার্মেন্টস, এনভয় প্যাকেজেস, এনভয় ডিজাইন, এনভয় ফ্যাশনস ও এনভয় টেকনোলজি-তালিকায় রয়েছে। এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী, রাশিদা আহমেদ, শারমিন সালাম, তানভীর আহমেদ ও শেহরিন সালামের নাম রয়েছে। তবে আবদুস সালাম মুর্শেদীর পরিবার ছাড়া অন্যদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান-গিভেন্সি গার্মেন্টস, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং এবং গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড অ্যাসেনশিয়াল-তালিকায় রয়েছে। এ গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন ও আবদুল হাদির নাম রয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের নাম রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে হোসনা আরা বেগম, মো. আতিউর রহমান, মাহমুদা বেগম, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফের নাম রয়েছে।

নিপা গ্রুপের নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস ও নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির নাম রয়েছে তালিকায়। ব্যক্তি হিসেবে আছেন সঞ্জীব চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মো. খসরু চৌধুরী, এম মুনিরুল ইসলাম ও মো. টিপু সুলতান। ওয়েল গ্রুপের ওয়েল অ্যাকসেসরিজ, ওয়েল ফ্যাশন ও ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির পাশাপাশি নাসরিন আখতারের নামও রয়েছে।

তুসুকা গ্রুপের তুসুকা প্যাকেজিং, তুসুকা স্টিচেস, তুসুকা অ্যাপারেলস, তুসুকা ফ্যাশনস, তুসুকা ওয়াশিং, তুসুকা প্রসেসিং, তুসুকা ডেনিম, তুসুকা জিনস ও তুসুকা ট্রাউজার্সের নাম রয়েছে তালিকায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, একরামুল হক ও মো. আতিউজ্জামানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তালিকায় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান, ফরিদা মান্নান, সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, ফরিদা ইলিয়াস, আবদুস সালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহিদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলাম, মো. আসিফ হাসান, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম, নাসরিন আফরোজ, আখতারুন্নেসা ও জিনাত ইসলামের নাম রয়েছে।

এনবিআরের আরেকটি সূত্র জানায়, ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের জামাই আলিফ মোল্লার নামও রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।

এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েকটি সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ যাচাইয়ে তাঁদের আর্থিক লেনদেনের উৎস, গন্তব্য ও অর্থ ব্যবহারের ধরন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বর্তমানে কারাগারে, আবার কেউ কেউ পলাতক রয়েছেন। তদন্ত এখনো চলমান। অনুসন্ধানে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তালিকায় আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ করার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি এনবিআরের কর্মকর্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights