১=১৮ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল, বিপর্যস্ত তবু মাথা নোয়াবে না ইরান
অনলাইন ডেস্ক
বর্তমানে ইরান এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধ এবং অন্যদিকে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের ফলে দেশটির অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
গত শনিবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। বাজারের এই অস্থিরতায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক বিক্রেতা অধিক মুনাফার আশায় পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন।
দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৮ লক্ষ ৪০ হাজার রিয়াল গুনতে হচ্ছে যা দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। মুদ্রাবাজারে এই ধসের ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে বিলাসবহুল প্রযুক্তিপণ্য এবং গাড়ির বাজারে হাহাকার পড়ে গেছে।
তেহরানের স্থানীয় দোকানগুলোতে একটি আইফোন কিনতে হলে ক্রেতাকে এখন কয়েকশ কোটি রিয়াল খরচ করতে হচ্ছে যা পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর সরকারি কড়াকড়ি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
টানা ৬৪ দিন ধরে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা ও পরিষেবা খাতগুলো ধসে পড়েছে। এই ব্ল্যাকআউটের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অথবা তাদের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন কারণ ইন্টারনেটের অভাবে তারা না পারছেন অর্ডার নিতে, না পারছেন গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে।
গাড়ির বাজারের অস্থিরতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শুক্রবার এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে প্রতিদিন গাড়ির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সরকার এই পরিস্থিতির জন্য বিক্রেতাদের লোভ এবং মনস্তাত্ত্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে দায়ী করেছে। সাধারণ একটি ফরাসি মডেলের গাড়ি যা ইরানেই উৎপাদিত হয়, সেটির দাম এখন আকাশচুম্বী। বিদেশের বাজার থেকে গাড়ি আমদানি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় স্থানীয় বাজারে ব্যবহৃত পুরনো গাড়ির দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানের বর্তমান মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১৭ কোটি রিয়ালেরও কম, যা ডলারের হিসাবে মাত্র ৯২ ডলারের কাছাকাছি। সম্প্রতি সরকার বেতন ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কাছে তা নস্যি বলে মনে করছেন সাধারণ নাগরিকরা। সরকার প্রতি মাসে খাদ্য সহায়তার জন্য যে ভর্তুকি দিচ্ছে তার পরিমাণ মাথাপিছু ১০ ডলারের মতো যা দিয়ে এক সপ্তাহের বাজার করাও অসম্ভব। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান যে এখন মানুষ সঞ্চয় করার চেয়ে হাতে থাকা অর্থ দিয়ে জরুরি কিছু কিনে রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে।
শিল্পনগরীগুলোতেও চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। তেহরানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ইসফাহানের বিশাল ইস্পাত কারখানাগুলো পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত কত মানুষ বেকার হয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী কর্মসংস্থানের এই সংকট দেশটির সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই এক বিবৃতিতে দেশের জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন যে সামরিক ফ্রন্টে ইরান যেমন তার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, তেমনি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধেও শত্রুকে পরাজিত করতে হবে। তিনি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিক ছাঁটাই না করার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে ইরান প্রগতি ও অগ্রগতির পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে কতটা আশার সঞ্চার করতে পারবে তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো এবং দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় কুশাসন এবং বহির্বিশ্বের চাপ মিলে ৯ কোটি মানুষের এই দেশটিকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেলের খনি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ এখন দুই বেলা খাবারের সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।
সূত্র: আল জাজিরা
