২ লিটার জ্বালানি নিতে ৮ ঘণ্টা

মগবাজারের একটি গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মী হাবিবুর রহমান। কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন তাঁকে মোটরবাইকে করে বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় যেতে হয়। কিন্তু জ্বালানিসংকটের কারণে গত সোমবার তিনি কর্মস্থলেও যেতে পারেননি, যেতে পারেননি নির্ধারিত দুটি গার্মেন্টেও। মাত্র ২ লিটার তেল নিতে তাঁর জীবন থেকে চলে গেছে প্রায় ৮ ঘণ্টা। রাজধানীতে জ্বালানি সংকটে এমন ভোগান্তিতে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিতে পড়ছে অনেকের চাকরি ও ব্যবসাবাণিজ্য।

সোমবার বিকালে নিকুঞ্জ পেট্রোল পাম্পের সামনে কথা হয় হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, শনিবার রাত থেকেই তাঁর বাইক রিজার্ভ তেলে চলছিল। রবিবার একটি পাম্পে গিয়ে দেখেন ২ শতাধিক বাইক লাইনে। এরপর কয়েকটি জায়গায় খোলা তেলের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে বাইকের তেল আরও কমে যায়।

অবশেষে তেল ছাড়াই কর্মস্থলে ফেরেন। সোমবার ভোরে তেল নেওয়ার আশায় বাসা থেকে বের হলেও সকাল ৭টার দিকে তেলের অভাবে ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়েতে বাইক বন্ধ হয়ে যায়। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর এক বাইকারের কাছ থেকে ২০০ মিলিলিটারের মতো তেল পান। তেল নিয়ে নিকুঞ্জ পাম্পে পৌঁছালে সেখানে ‘তৈল নাই, পাম্প বন্ধ’ লেখা ব্যানার দেখতে পান। কর্মচারীরা জানান, বিকাল ৩টার পর তেলের গাড়ি আসবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সোয়া ৩টার দিকে তিনি দুই লিটার অকটেন পান। হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এই তেলে এক দিন চলবে। এরপর কী হবে জানি না। কাজ মিস করলে চাকরিটা থাকবে না।’ পাম্পে অপেক্ষমাণ অনেকেই জানান, তারা সকাল ১০টার আগেই বাইক রেখে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ বাইক রেখে কাছাকাছি দূরত্বে জরুরি কাজ শেষ করে ফিরে এসেছেন।

বিকাল পৌনে ৩টার দিকে পাম্পে দুটি ট্যাংকারে ৯ হাজার লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার লিটার অকটেন আসে, যা অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন ৬০-৬৫ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো, এখন সেখানে এসেছে মাত্র ১৮ হাজার লিটার। তবে সরকার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল বলেন, মার্চে সরবরাহে সমস্যা হয়নি। এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা বিবেচনায় বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মোটরসাইকেলই ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। এ ছাড়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহন মিলিয়ে আরও কয়েক লাখ যান প্রতিদিন রাজধানীর সড়কে চলছে। ঢাকার বাইরে নিবন্ধিত অসংখ্য যানবাহনও চলছে রাজধানীতে। জ্বালানি নেওয়ার সীমা নির্ধারণের ফলে বিপুলসংখ্যক যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে পাম্পকেন্দ্রিক যানজট ও ভোগান্তি বাড়ছে।

রাইড শেয়ারে স্বস্তি, দুশ্চিন্তায় কর্মজীবীরা : জ্বালানি সীমাবদ্ধতায় ঈদের আগে প্রায় বন্ধের মুখে পড়ে রাইড শেয়ারিং সেবা। অনেক চালক তেল না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। আবার যারা চালু রাখেন তারা ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রাইড শেয়ারিং মোটরবাইকের জন্য দিনে ৫ লিটার তেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সাধারণ কর্মজীবীরা বলছেন, দৈনিক দুই লিটারের সীমা তাদের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। অফিস শেষে পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যায় না, আবার সকালে বের হয়েও একই অবস্থা। গণপরিবহনে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়, রিকশায় যাতায়াতে অনেক খরচ।

একটি ডেভেলপার কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার রেদোয়ান বলেন, সারা দিনে অসংখ্য জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। বাইকের বিকল্প নেই। অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি বন্ধ করতে পেশার আইডি কার্ড দেখে তেলের সীমা বাড়ানো যেতে পারে। রসিদে কতটুকু তেল দেওয়া হলো ও কত কিলোমিটার চলেছে তা লিখে দিয়েও অপব্যবহার কমানো সম্ভব। কারণ অনেকেই বেশি তেল নিয়ে খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights