৩০০ ডিজিটাল প্রতারকের ফাঁদ

অনলাইন ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে ডিজিটাল ফাঁদ পেতেছিল চীনা একটি প্রতারকচক্র। এর জন্য চক্রের অন্তত ৩০০ সদস্য অবস্থান নেন কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকার বিভিন্ন রিসোর্টে।

এসব রিসোর্টে তাঁরা ডিজিটাল ল্যাবও স্থাপন করেছিলেন। চক্রের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছিল বিশ্বাসের সম্পর্ক। এর জন্য দেখানো হচ্ছিল বিপুল মুনাফার লোভ। এভাবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেছিল চক্রটি।

প্রতারক এই চক্রের এসব ডিজিটাল প্রতারণার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে।

চক্রটির বিরুদ্ধে এরই মধ্যে কক্সবাজারের রামু থানায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার মামলা করা হয়েছে। মামলাটি নিয়ে পুলিশ বিপুল পরিসরে তদন্ত শুরু করেছে। শুধু মেরিন ড্রাইভের রিসোর্ট নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে চক্রটির নেটওয়ার্ক।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতারকচক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৯৪ জন চীনা নাগরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কক্সবাজার পুলিশ চক্রটির আরো অন্তত ২৯৫ জন চীনা নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেছে।

এদিকে মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারকচক্রের ঘাঁটির সন্ধান পেয়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে অভিযান চালিয়ে অন্তত পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় করা মামলার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। এ জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল রামু থানায় করা সাইবার মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের টিমটি দ্রুতই কক্সবাজারে আসবে বলে জানা গেছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র গতকাল বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্র জানায়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারকচক্রের সদস্যরা পরিপূর্ণভাবে তাঁদের অবৈধ কার্যক্রম শুরু করতে পারলে বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটে যেত। তার আগেই পুলিশ প্রতারকচক্রের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে দুই হাজার আইফোন ছাড়াও ল্যাপটপ-কম্পিউটার এবং নানা ধরনের ডিভাইসসহ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এতে মহাপ্রতারণার হাত থেকে বাংলাদেশসহ আরো তিনটি দেশ রক্ষা পেয়েছে।

কক্সবাজার পুলিশ গত ২৫ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, ৪০টি মাউস, চীনা দুটি পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ, একটি ডায়েরিসহ পাঁচ চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, চক্রটির নজর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ওপরও ছিল।

একদিকে মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে গড়ে তোলা অত্যাধুনিক সাইবার ল্যাব, অন্যদিকে হাজার হাজার মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে গড়ে তোলা হয় আর্থিক লেনদেনের জাল। সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার ভয়ংকর এক নেটওয়ার্ক।

টানা ১০ দিনের পর্যবেক্ষণ : কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোয় প্রতারকচক্রের গড়ে তোলা আস্তানায় চীনা নাগরিকদের ওপর টানা ১০ দিন ধরে নজর রাখছিল জেলা পুলিশ। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জেলা পুলিশের চৌকস কয়েকজন সদস্যকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমার ভয় ছিল ফেসবুকের স্ট্যাটাসে যদি ঘটনাটি কেউ জেনে যেত তাহলে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে চাউর হয়ে যেত। তখন অভিযানের পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যেত।’

নজরদারিতে মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে চীনা নাগরিকদের ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়। সরকার তখনই বিষয়টি ঢাকায় চীনা দূতাবাসকে অবহিত করে। চীনা দূতাবাস বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের তিন সদস্যকে কক্সবাজারে পাঠায়। তিন সদস্যের দলটি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে চীনা নাগরিকদের গড়ে তোলা গোপন আস্তানা দেখে হতবাক হয়ে যায়। চীনা দূতাবাসের সদস্যরা নিজেদের নাগরিকদের ডিজিটাল প্রতারণার এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেন। এর পরই চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, তাদের নাগরিকদের যেন বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আনা হয়।

হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ ভিলাস’ রিসোর্ট। বড় হলরুমজুড়ে কম্পিউটার ল্যাব। সঙ্গে ছয়টি কক্ষ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো শব্দ ঢুকতে বা বের হতে না পারে। এটিই আসলে চীনা প্রতারকচক্রের অত্যাধুনিক ল্যাব।

পুলিশ বলেছে, তথ্য-প্রযুক্তির ‘উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন’ চীনা প্রতারকচক্রের সরাসরি সদস্যসংখ্যা ৯৪। তাদের হয়ে কাজ করতেন আরো দুই শতাধিক চীনা নাগরিক। গত আগস্টের শেষ দিকে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে এই ল্যাব দুই দফা পরিদর্শনে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং কক্সবাজারের পুলিশ সুপার বলেছেন, ল্যাব থেকে জব্দ করা ‘ইলেকট্রনিক ডিভাইস’ ফরেনসিক করে এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এআই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে লোভনীয় তথ্য আদান-প্রদান করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের প্রলোভন দিতে শুরু করেছিলেন চক্রটির সদস্যরা। এসবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিনিয়োগের পর প্রথমে সামান্য মুনাফা দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে আরো বেশি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করতে শুরু করেছিল প্রতারকচক্রটি।

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযান : পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লুম রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিকের অবস্থানের তথ্য উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে এক চীনা নাগরিক গত এপ্রিল থেকে এসব রিসোর্ট ও আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। ‘বাবর আলী’র প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তার সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন। অন্যদিকে উ ওয়েইপিং নামের আরেক চীনা নাগরিক ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে বলতেন তিনি। তবে বিশেষ শাখার অনুসন্ধানে ওই নামের কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের সময়োপযোগী পদক্ষেপ : পুলিশ সূত্র জানায়, চীন-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনোভাবে যাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয় তা মাথায় রেখে কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারকচক্রের ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। চীনা নাগরিকদের ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি চীনা কর্তৃপক্ষকে অবগত করেই সাইবার আইনের মামলাটি করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তখনকার সরকারের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সময় অনলাইনে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলারের বাংক রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছিল। ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার কাছে এখন পর্যন্ত চুরি যাওয়া ছয় কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনাদায়ি রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ায় ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।’

চীনা প্রতারকচক্রের সন্ধান মিলল যেভাবে : কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, চীনা প্রতারকচক্রের কর্মকাণ্ড গত মার্চ থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তখন থেকেই তাদের আনাগোনা শুরু হলেও রিসোর্টে ডিজিটাল ল্যাব তৈরির কাজ শুরুর পর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। পুলিশের অনুসন্ধান বলছে, প্রথমে ছদ্মবেশে চীনাদের পরিচয় ছিল নির্মাণ সংস্থায় কাজ করতে আসা। চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে আসেন কর্মসংস্থান ভিসায় (ই-ভিসা)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টস (ডিআইপি) চীনাদের বাংলাদেশে আসার বিষয়টি জানলেও এসবির ফরেন ডেস্ক (বা প্রবাসী/বিদেশি সহায়তা সেল) জানত না।

চক্রে ৩০০ চীনা নাগরিক : কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের চারটি রিসোর্টেই ছিলেন দুই শতাধিক চীনা নাগরিক। তাঁরা দিনের বেলায় রুমের বাইরে যেতেন না। তাঁদের ব্যবহারের জন্য ছিল কয়েকটি মাইক্রোবাস। কালো গ্লাসের গাড়িগুলোতে তারা মুখ ঢেকে চলাফেরা করতেন। তাঁদের গাইড করতেন স্থানীয় শাহজাহান, আকতার কামাল ও ক্যাসন নামের তিন তরুণ। চীনারা নিজেদের দেশ থেকে তাঁদের রান্নার লোক সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। রাতের বেলায় তারা রিসোর্টের রুম থেকে বের হতেন।

কক্সবাজারের পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রামু থানায় করা সাইবার আইনের মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ চীনা নাগরিকের নাম উল্লেখসহ আড়াই শ থেকে তিনশ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, এরই মধ্যে ২৯৫ জন চীনা নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করে তা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights