৪২.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়া, মাটির নিচেই ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু
অনলাইন ডেস্ক
এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে কৃষি ও প্রাণিজগতে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। ১২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবদাহের মুখোমুখি দক্ষিণ কোরিয়া। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, মাটির নিচে থাকা কাঁচা আলু ক্ষেতেই গলে নরম হয়ে একেবারে ‘সেদ্ধ’ আলুর মতো হয়ে গেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিউল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গ্যাংওন প্রদেশের ইয়াংগু কাউন্টিতে আলুচাষি লি সাং-হিউক মাটি খুঁড়ে দেখেন, সংরক্ষণ করার মতো কোনো ফসলই অবশিষ্ট নেই। অথচ এক সপ্তাহ আগেও তার খেতের আলুগুলো স্বাভাবিক ছিল। এবার মাটি থেকে ওঠানো আলুগুলো দেখে মনে হচ্ছে ‘সেদ্ধ’ গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯০৪ সালের পর দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই তাপপ্রবাহে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালিত প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে। পরিস্থিতির মধ্যে কর্তৃপক্ষ তাপ সতর্কতা জারি করে মানুষকে সব ধরনের বাইরের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ রাখার আহ্বান জানায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভাকে বলেন, এমন চরম আবহাওয়া এর আগে দেশটি দেখেনি। তার মতে, এ ধরনের আবহাওয়া ভবিষ্যতে ‘নিউ নরমাল’ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিবেশী জাপানেও একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা এ বছর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার জন্য ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরম দিন’ নামে নতুন একটি শ্রেণি চালু করেছে। টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোকে তিনটি সিংহের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
হংকংয়েও তৈরি হয়েছে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড। টাইফুন ডলফিনের বাইরের অংশ শহরের ওপর দিয়ে উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত করার সময় সেখানে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর এটিই হংকংয়ের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
তবে রেকর্ড তাপমাত্রার মধ্যেও বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য হংকংয়ের হিট-স্ট্রেস সতর্কতা ব্যবস্থা সর্বনিম্ন স্তরেই ছিল। এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন হংকং অবজারভেটরির সাবেক প্রধান লাম চিউ-ইং। তার মতে, লাল সতর্কতা জারির সীমা এতটাই বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে যে রেকর্ড তাপমাত্রাও যদি সেটি সক্রিয় না করে, তাহলে এই ব্যবস্থা কার্যত শুধু প্রদর্শনের জন্যই হয়ে যায়। পরে হংকংয়ের শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, তারা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে সতর্কতা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করছে।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াংয়ে জুলাইয়ে একটি আবহাওয়া কেন্দ্র ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটানা কয়েকটি ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ দেখা গেছে, যেখানে রাতের তাপমাত্রাও ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এশিয়ার জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এশিয়ার উষ্ণায়নের গতি তার আগের ৩০ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় এই তাপপ্রবাহের বড় ধাক্কা এসেছে কৃষকদের ওপরও। সিউল থেকে প্রায় ২৫৭ কিলোমিটার দক্ষিণে গওয়াংজুতে তরমুজচাষি হং কিয়ং-হি জানান, সাধারণত উচ্চ দামে বিক্রি হওয়া তার তরমুজগুলো হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ভেতরের অংশ, মিষ্টতা—সবকিছুই ঠিক ছিল; কিন্তু মাত্র তিন দিনের মধ্যে ফলগুলো রাতারাতি পচে যায়। পাঁচ দশকের কৃষিজীবনে এমন ঘটনা তিনি প্রথম দেখেছেন।
দক্ষিণ জিওলা প্রদেশের দামইয়াং কাউন্টির স্ট্রবেরিচাষি ইউন উ-হা তিন মাস ধরে পরিচর্যা করা চারাগাছ হারিয়েছেন। এসব ক্ষতির ক্ষেত্রে তিনি বীমার সুবিধাও পাবেন না। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার ফসল বীমা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ফসল, চাষপদ্ধতি ও অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকায় এর বাইরে কোনো ক্ষতি হলে কৃষকেরা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন।
