কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে এবারও শঙ্কা

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

সরকারনির্ধারিত দামে চামড়া কেনা নিয়ে এবারও শঙ্কা প্রকাশ করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম, সংরক্ষণে দুর্বলতা ও পরিবহন জটিলতায় এবারও বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এই শঙ্কার মধ্যে আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছেড়েছেন ট্যানারি ব্যবসায়ীরা। প্রায় ১ কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে ট্যানারি মালিকদের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে মাঠে থাকবে তাদের মনিটরিং টিম। কোরবানির পশুর চামড়া যাতে পাচার হয়ে না যায়, সে লক্ষ্যে সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর থেকে ২ টাকা বাড়িয়ে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভিতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এই হিসাবে গরুর চামড়ার দাম কমবেশি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কয়েক বছর ধরে ৩ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না গরুর চামড়া। অপরদিকে বকরির চামড়া কেউ কিনছেই না। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন দেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকারী ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন। কোরবানির ঈদে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ও ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রির মূল কাজটি এই সংগঠনের সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই সংগঠনের সাবেক সভপতি আফতাব খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ অর্জন করতে পারেনি। পাশাপাশি সাভারের ট্যানারিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পরিপূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়ায় এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এখন দেশের চামড়া চীন ছাড়া আর কোথাও রপ্তানি করা যাচ্ছে না। ফলে গত কয়েক বছর চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আসন্ন ঈদে চামড়া সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে আফতাব খান জানান, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতে তাঁরা এখনো টাকা পাননি ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে। আজকালের মধ্যে টাকা পেলে চামড়া কেনার টার্গেট ঠিক করবেন। এসব বিষয় নিয়ে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ব্যাংকিং সহায়তা না পাওয়ায় বাজারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছেন না। ব্যবসার মূলধন থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে চামড়া কেনার উদ্যোগ নিচ্ছেন। ন্যয্য দামে চামড়া সংগ্রহের জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বিতরণ শুরু করেছেন বলেও জানান তাঁরা। চামড়ার দাম কম প্রসঙ্গে ট্যানারি মালিকরা জানাচ্ছেন, সচেতনতার অভাবে অনেকে সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন না। সময়মতো লবণ না দেওয়ায় চামড়া পচে যায়। ফলে কাক্সিক্ষত দামও পাওয়া যায় না। চলতি মৌসুমে গ্রীষ্মের গরমের পাশাপাশি প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালি আচরণের কারণেও চামড়া ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে ট্যানারি মালিকরা আশঙ্কা করছেন।

১ কোটি পিস চামড়া কেনার টার্গেট, টাকা দেয়নি ব্যাংক : বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, আসন্ন ঈদের মৌসুমে দেশের ট্যানারি শিল্পগুলো প্রায় ১ কোটি পিস লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সংগ্রহের টার্গেট নিয়েছে। এজন্য তাঁরা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাজেট রাখছেন। এর একটি অংশ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারে ছাড়ছেন। এই বাজেট থেকে তাঁরা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যও সংগ্রহ করেছেন। তবে ব্যাংক সহায়তা পেলে তাঁদের বাজেট আরও বাড়ত বলে জানান ট্যানারি শিল্পের এই নেতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা দেওয়ার পরও ব্যাংকগুলো চামড়া কিনতে কোনো ঋণ দেয়নি। রপ্তানির বিপরীতে সরকার কিছু অর্থ ছাড় করেছে, যা ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার বেশি হবে না। ফলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দিতে পারেননি বলে জানান এই ট্যানারি মালিক।

চামড়া সংগ্রহ ও ক্রয়-বিক্রয়ে সমন্বয় কমিটি মনিটরিং সেল : সারা দেশে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি বিভাগওয়ারি সমন্বয়ক টিম গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশ থেকে সুষ্ঠুভাবে চামড়া প্রক্রিয়াজাত ও পরিবহন নিশ্চিত করতে দেশে ডিসি ও ইউএনওদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্যানারি মালিকদের সুপারিশে লবণ ছাড়া চামড়া পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় শেষে দেশের অভ্যন্তরে কোরবানির পশুর চামড়া পরিবহনে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না হয় সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন এবং কাঁচা চামড়া পাচার বন্ধে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তদারকি বাড়াতে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights