ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পর ঢাকায় স্বস্তি টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন

প্রতিদিন ডেস্ক

বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত তার স্পষ্ট অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারে স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া’।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ‘টু প্লাস টু’ বৈঠক সম্পর্কে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া’র সিনিয়র সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিতের একটি প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল প্রকাশ হওয়া এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একান্তভাবেই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ সমর্থন করে না ভারত।’ ‘টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তাদের মার্কিন সমকক্ষ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন-পঞ্চম ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিনোদ মোহন কোয়াত্রা বলেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা খুবই পরিষ্কারভাবে এই ইস্যুতে আমাদের অবস্থান তুলে ধরেছি।’ তিনি বলেন, ‘তৃতীয় কোনো দেশের নীতি নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ আমাদের (ভারতের) নেই। বাংলাদেশে নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’ কোয়াত্রার মন্তব্য, ভারত ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করে’। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থন নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশ কিছু পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নয়াদিল্লির এই মন্তব্য মার্কিন সংস্থাগুলোকে, বিশেষ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছে যে, তাদের প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা উচিত। আওয়ামী লীগ মনে করে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের অজুহাতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বাংলাদেশে পিটার হাসের নেতৃত্বাধীন মিশন, দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিগত দুটি সাধারণ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের’ লক্ষ্যকে সমর্থন করে গত মে মাসে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভিসানীতির ঘোষণা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটিকে আমেরিকার ‘নাক গলানো’ বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের আচরণ- যেমন তিনি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার কথা বলেছেন। একজন বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে তার এই তৎপরতার কারণে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং তার শরিক জামায়াতে ইসলামী-পশ্চিমাদের এই তৎপরতার সুযোগ নিচ্ছে এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করছে। এমতাবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত একই অবস্থানে আছে কি না- তা নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহলে নানা জল্পনা ছিল। তবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব কোয়াত্রার শুক্রবারের মন্তব্য সব ধরনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিও সম্প্রতি সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে একই ধরনের কথা বলেছিলেন। সুতরাং নয়াদিল্লির বার্তা- প্রতিবেশী বাংলাদেশের নির্বাচন তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি বা অবস্থান সুস্পষ্টভাবেই মার্কিন তৎপরতাকে প্রত্যাখ্যান হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং অংশীদার। আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করি। বাংলাদেশকে স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করতে ভারত সব সময়ই সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।’ ভারতের এই মন্তব্য গত ২৮ অক্টোবর বিরোধীদের সহিংস বিক্ষোভের পটভূমিতে এলো বলে মনে করা হচ্ছে। সহিংস ওই বিক্ষোভের সময় একজন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হামলা করা হয় প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও। সেদিন অনেক সাংবাদিককেও মারধর করা হয়েছে। কিন্তু সহিংস ওই ঘটনাগুলোর ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা ছিল খুবই সামান্য। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও তৃণমূল বিএনপি নামের নতুন রাজনৈতিক দলের সভাপতি শমসের মবিন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। কারণ স্থিতিশীলতা ও শান্তি বাংলাদেশের জন্য মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয়। বাংলাদেশ এই প্রগতিশীল রাজনীতির জন্যই সর্বদা লড়াই করেছে। আমাদের প্রত্যাশা যে, নয়াদিল্লির বার্তাটি মার্কিন সরকার ভালোভাবে গ্রহণ করেছে।’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া বলেছেন, ‘তিনি (কোয়াত্রা) আজ যা বলেছেন আমরা তার প্রশংসা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের পররাষ্ট্রনীতি হলো- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বিদ্বেষ নয়, যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি (কোয়াত্রা) যা বলেছেন আমরা তার প্রশংসা করি, কেননা এটি আমাদের প্রতি ভারতের সম্মানের বহির্প্রকাশ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights