একদিনের ভ্রমণে আহসান মঞ্জিল
ঝুমা আক্তার
ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান ঘুরে বেড়ানো আমার বড়ই শখ।সময় ও সুযোগ করে মাঝে মাঝেই বেড়িয়ে পড়ি এসব নিদর্শন নিজ চোখে পর্যবেক্ষণের জন্যে।
তবে বেশ কিছু দিন হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণরত।ক্যাম্পাসের খুব নিকটে থাকা সত্ত্বেও পরিদর্শন করা হয়নি এই অঞ্চলের বিখ্যাত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো।অতপর সেদিন বান্ধবীদের সাথে পরীক্ষা শেষ করেই চলে যাই বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নবাবদের তৈরি ঐতিহাসিক বাসবভন যা পরবর্তীতে জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
আহসান মঞ্জিল পুরান ঢাকায় ইসলামপুরের কুমারটুলী এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।
এটি পূর্বে ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদও জমিদার
দের সদর কাচারি ছিল।এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গণি।তিনি তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ’র নামানুসারে এর নামকরণ করেন।১৮৫৯খ্রিষ্টাব্দে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়।আহসান মঞ্জিল কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছে অতি সম্প্রতি, এখন এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক পরিচালিত একটি জাদুঘর।
আহসান মঞ্জিলে জলে ও স্থলে দু পথেই আসা যায়।জলপথে সদরঘাট থেকে নেমে পাঁচ মিনিটের পথ হেঁটেই আসা যায়।এবং স্থলপথে আসার উপায় হলো ঢাকার সদরঘাটগামী যে কোন বাসে উঠে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে নেমে যেতে হবে। সেখানে থেকে পায়ে হেঁটে কিংবা ৩০টাকা রিকশা ভাড়ায় আহসান মঞ্জিলে যেতে পারবেন।অথবা গুলিস্তানে নেমে সেখান থেকে রিকশা ভাড়া করে ও এখানে আসা যায়।
পরিদর্শনের প্রথমেই যেই বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করে তা হলো জাদুঘরের বাইরের পরিবেশ। প্রাসাদের দুতলা থেকে আঙিনায় নেমে আসার প্রশস্ত সিড়ি,সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিসমাস গাছ, নারিকেল গাছ ও বিভিন্ন ফুলের বাগান সব মিলিয়ে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি করে। এছাড়া প্রবেশ পথে ব্যাগ রাখার সুব্যবস্থা রয়েছে।
মঞ্জিলটি দুটি অংশে বিভক্ত, পূর্ব পাশের গম্বুজযুক্ত অংশকে বলা হয় প্রাসাদ ভবন অথবা রংমহল পশ্চিমাংশের আবাসিক প্রকোষ্ঠ
নিয়ে গঠিত ভবনকে বলা হয় অন্দরমহল।প্রাসাদ ভবনটি আবার দুটি অংশে বিভক্ত।
মাঝখানের গোলাকার কক্ষের ওপর অষ্টকোণ বিশিষ্ট উঁচু গম্বুজটি অবস্থিত।
দোতলা এই প্রাসাদের মেঝে ও বারান্দা তৈরি হয়েছে মার্বেল পাথর দিয়ে। প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে খাবার ঘর,জলসাঘর, দরবার ঘর, লাইব্রেরি, বিলিয়ার্ড খেলার ঘর।
দ্বিতীয় তলায় রয়েছে অতিথি
কক্ষ,থাকার ঘর, বৈঠকখানা, নাচঘর সহ আরও কিছু থাকার ঘর।এছাড়া উপরের তলায় পৌছানোর জন্য লালগালিচায় আবৃত কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। যদিও বর্তমানে সিঁড়িটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ২৩টি গ্যালারিসহ এই ভবনে প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রদর্শনীর জিনিস রয়েছে।
আহসান মঞ্জিলে প্রদর্শনের জন্য রয়েছে নবাব আমলের ডাইনিং রুম, নবাবদের ব্যবহৃত বড় বড় আয়না, আলমারি, সিন্দুক,কাচও চিনামাটির তৈরি থালাবাসন, আলমারি, বিভিন্ন ধরনের অলংকৃত রুপা ও ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার- টেবিল, ফুলদানি, ঝাড়বাতি, আতরদানি,পানদান,সোনা ও রুপা তায়জালি কাজ।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয হলো দোতলা থেকে সরাসরি প্রাসাদের আঙিনায় নামার প্রশস্ত সিঁড়ি। যা দর্শনার্থীদের পছন্দের কেন্দ্রবিন্দু।সৌন্দর্য্যে বিমোহিত পরিদর্শকগণ এখানে সুন্দর মূহুর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
এছাড়া অন্দরমহলে রয়েছে অফিস, ঘোড়ার গাড়িতে সলিমুল্লাহ এর ভাস্কর্য, নওয়াবদের মোটরযান, নওয়াবদের বজরা,স্টিমার, প্রভাবশালী কর্মচারীদের প্রতিকৃতি,শয়নকক্ষ এবং হাম্মামখানা ইত্যাদি। এভবনের ছাদনির্মাণে লোহার কড়ি বরগা ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্দরমহলের নিচতলায় বাইরের দিকে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা রয়েছে এগুলো নিয়মিত পরিস্কার – পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য লোক রয়েছে।
জাদুঘর পরিচায়কদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, উৎসবের দিনগুলোতে জাদুঘরে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীর থাকে।এছাড়া বিদেশী পর্যটকগণএখানে ঘুরতে আসেন।যা আমার নিজ চোখে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ফলে আসা করা যায় বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং আমাদের পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
