‘৫৩ বছরেও মেলেনি স্বীকৃতি’ বিজয়ের উল্লাস নেই বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্লাহর পরিবারে

নোয়াখালী প্রতিনিধি :
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্ত না হওয়ায় বিজয়ের উল্লাস নেই বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্লাহর পরিবারে। মুক্তিযোদ্ধার সকল কাগজপত্র’সহ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও কোন সাড়া না পেয়ে চরম হতাশায় ও মানবেতর জীবন-যাপন করছে একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদাউস। হেদায়েত উল্লাহ একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা এমন মন্তব্য করে তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গ্যাজেটভুক্ত করার দাবি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের।
মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসলেই চরম হতাশায় ভেঙ্গে পড়েন নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদাউস। বাবা ও স্বামী হারা জান্নাতুল এক পুত্র সন্তানকে নিয়ে থাকেন অন্যের আশ্রয়ে। লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের বাসিন্দা বাবা হেদায়েত উল্লাহ চাকুরি করতেন বাংলাদেশ রেলওয়ে খুলনা অ লে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে হেদায়েত উল্লাহ ভারতের কাঠালিয়ায় টেনিং শেষ করে দেশে ফিরে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্যার একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, তার বাবা রেলওয়ে চাকুরি করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতে ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরেই প্রথমে আমাদের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের শহর কসবায় যান মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ি গিয়ে দেখেন মা বেঁচে নেই। রাজাকাররা আমার দাদিকে মেরে ফেলেছেন। নকশালের জিল্লুর রহিমসহ প্রভাবশালীরা আমাদের সব জায়গা-জমিও দখল করে নিয়ে গেছেন। পরে সেখানে আমার বাবাকে রাজাকাররা খুঁজতে থাকলে তিনি আশ্রয় নেন লক্ষ্মীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান কামালের বাসায়। সেখানে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়ে বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। পরে শাহজাহান কামালের নেতৃত্বে আমার বাবা হেদায়েত উল্লাহসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার-হানাদারদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে প্রহিতত করে। ইত্যেমধ্যে কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট ২ নম্বর সেক্টর থেকে আমার বাবা হেদায়েত উল্লাহর কাছে খবর আসে সেখানে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। পরে তিনি কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট ২ নম্বর সেক্টরে প্রফেসর এম.এ রব ভূঁইয়া, নজির ভূঁইয়া, সার্জেন্ট আবুল হাসেমসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। সেখানে পাকিস্তানী হানাদার ও রাজাকারদের সঙ্গে সম্মূখ যুদ্ধে আহত হন আমার বাবা হেদায়েত উল্লাহ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী পেয়েছেন এম.এ.জি ওসমানী সনদ (নং-১৭৭৩৭)। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও রয়েছে আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্লাহর নাম।
জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, এতটা ত্যাগের পরও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের সকল কাগজপত্র এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালের দেওয়া প্রত্যায়নসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে এখনো বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত করা হয়নি আমার বাবার নাম। আমি বাবা এবং স্বামীকে হারিয়ে অন্যের আশ্রয়ে আছি দীর্ঘদিন। কনোনাকালীন সময়ে আমি এবং আমার সন্তানকে কেউ বাড়িতে আশ্রয় দেয়নি। ছিলাম মসজিদ ও মাদ্রাসার বারান্দায়। এখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে আমার সংসার চলছে।
জান্নাতুল আরো বলেন, বিজয়ের মাস দিয়ে আমরা কি করমু, আমাদের কি লাভ? আমার বাবা তো সরাসরি যুদ্ধ করেছে, কি লাভ হয়েছে। আমার বাবাকে রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি, আমার কাছে তিন লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক মো. শাহ্ আলম। টাকা দিতে না পারায় আমার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা হয়নি। একখন্ড জমির জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন করেছি, আশ^াস পেয়েছি, কিন্তু এখনো জমি পায়নি।
মো. শাহ আলম আমিন, ছালেহা বেগম’সহ স্থানীয় লোকজন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন না করেও বহু লোক ক্ষমতা আর টাকার বিনিময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন। অথচ হেদায়েত উল্লাহ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় তিনি মাকে হারিয়েছেন, জায়গা-জমি হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন নিজেও। তার একটি মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু টাকা ও অভিভাবক না থাকায় হেদায়েত উল্লাহকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত করা হয়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
হেদায়েত উল্লাহকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালের দেওয়া প্রত্যায়নে লিখেন, লক্ষ্মীপুরের শহর কসবা গ্রামের মরহুম দেনায়েত উল্যা মিয়ার ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্লাহ মিয়া মুক্তিযুদ্ধে প্রাপ্ত এম.এ.জি ওসমানী সনদপত্র-১৭৭৩৭ তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদাউস তাঁর নাম গ্যাজেটভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছেন। আমার জানামতে এবং কাগজপত্রের আলোকে হেদায়েত উল্লাহ একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁকে নতুন মুক্তিযোদ্ধা গ্যাজেটে অর্ন্তভূক্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সুপারিশ করছি।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, লক্ষ্মীপুর জেলা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির রণাঙ্গনের সঙ্গী বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত উল্লার নাম গেজেটভুক্ত না হওয়ায় রাগে-ক্ষোভে কাঁদলেন। তিনি বলেন, অনেক অমুক্তিযোদ্ধা টাকার বিনিময়ে গ্যাজেটে নাম অর্ন্তভুক্ত করিয়েছেন। অথচ হেদায়েত উল্লাহ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। সে সরাসরি পাক হানাদার ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। তার সব জায়গা-জমিও প্রভাবশালীরা নিয়ে গেছে। তাঁর একটি মেয়ে অসহায় অবস্থায় মানুষের ধারে ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু টাকা খরচ করতে না পারায় এবং সঠিক গার্ডিয়ান না থাকায় হেদায়েত উল্লার নাম গ্যাজেটভুক্ত হয়নি। হেদায়েত উল্লাহদের গ্যাজেটভুক্ত করলে তাদের আত্মা শান্তি পাবে বলে মনে করেন এই বীর সন্তান।
কোন জটিলতা ছাড়াই মহান মক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতির বীর সন্তানদের নাম অর্ন্তভুক্ত হবে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় এবং বাদ দেওয়া হবে ভুয়া-অমুক্তিযোদ্ধাদের এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights