আগুনে প্রাণহানির ঘটনায় বুয়েটে বিক্ষোভ

জুলকার নাইন

খোদ ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অর্ধেকের বেশি ৫৪ শতাংশ ভবন রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। শুধু আগুন লাগলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে দেখা যায় এসব ভবন আগেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায়। অথচ একটি ভবনকে কার্যক্রম চালাতে আটটি সংস্থা থেকে নিতে হয় অনুমোদন বা ছাড়পত্র। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি দেখার কেউ থাকে না। বরং নানাভাবে ম্যানেজ হয়ে যায় রাজউক, সিটি করপোরেশন ও গণপূর্তসহ দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করতে না পারলে অগ্নিকাণ্ড ঘটতেই থাকবে এবং যাদের এসব দেখার কথা তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ফায়ার সার্ভিসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভবন আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এরপর চট্টগ্রামে আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে ৫৪ দশমিক ২৯ শতাংশ ভবন। অর্থাৎ দুই শহরেই অর্ধেকের বেশি ভবন রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। এর মধ্যে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণের মধ্যে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজও ছিল। এটিকেও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে রুটিন মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে এর আগে এই ভবন মালিককে তিনবার নোটিস দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। মানুষের আসা-যাওয়ার জন্য কেবল একটি ছোট সিঁড়ি ছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় মানুষ যে কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে কোনো জানালা ছিল না। গতকাল জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে মালিকদের চিঠি দিই। আমাদের কাজ সমস্যা চিহ্নিত করা, মানুষকে সচেতন করা। বল প্রয়োগ করা আমাদের কাজ নয়। যারা মানছে না আমরা তাদেরও চিহ্নিত করি। আইন প্রয়োগ করার জন্য অন্য সংস্থা রয়েছে। এ ভবনটিতে নকশা এবং ভবন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিল রাজউক। এখন কেন আগুন ভয়াবহ রূপ পেল এবং কেন এত প্রাণহানি ঘটল, তা খতিয়ে দেখার কথা বলছে রাজউক। আবার গ্রিন কোজি কটেজকে বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছিল সিটি করপোরেশন। এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিন হেলালী বলেন, আগুন লাগা রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে যারা নোটিস দিয়েছিল তারা এখন শুধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিচ্ছেন। তারা নোটিস দিয়ে দোষ শুধু ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে তুলে দিচ্ছেন। এই ঘাড়ে তোলাতুলি বন্ধ না করলে সমস্যা সমাধান হবে না। যারা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে তারা মূল অথরিটি। কারণ তাদের হাতেই আইন আছে, আমাদের ব্যবসায়ীদের হাতে কোনো আইন নেই। আমিন হেলালী বলেন, এ ভবনে যারা ব্যবসা করতে এসেছেন তারা কি কোনো সার্টিফিকেট ছাড়া এসেছেন? সার্টিফিকেটগুলো কীভাবে পেয়েছেন? যারা ব্যবসা করতে এসেছেন তাদের সার্টিফিকেটগুলো যারা দেন তারা এতদিন কী করেছেন? এফবিসিসিআইয়ের এই নেতা বলেন, আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের শৃঙ্খলাগুলো রক্ষা করা হচ্ছে না। এক একটা করে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনা ঘটার পর আমরা একে দোষ দিচ্ছি, ওকে দোষ দিচ্ছি। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের কার কী দোষ সেগুলো বের করি, সেটা না করে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে আসতে হবে। যার যে দুর্বলতা আছে সেটাকে আইডেন্টিফাই করে আর যেন এমন দুর্ঘটনায় পতিত না হতে হয় সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেই জায়গায় আমাদের অবস্থান নিতে হবে।

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, যারা রেগুলেটরি বোর্ডে আছেন তাদের কোনো শাস্তি হয় না, তারা শুধু নোটিস দেন। নোটিস বড় কোনো ব্যবস্থা নয়, আপনারা কেন সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেন না, সেটা হচ্ছে প্রশ্ন? যেসব রেগুলেটরি বোর্ড এ ভবনে ব্যবসার অনুমতি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিক। এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটুক তা আমরা চাই না। যার ত্রুটি থাকবে তার বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে। সেটা যদি কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হয় তবে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, আর যদি কোনো সংস্থার বিরুদ্ধে হয় তবে সেটা সংস্থার বিরুদ্ধে। সবকিছু বাণিজ্যিকীকরণ করবেন আর সেটার মাধ্যমে মানুষের জীবন চলে যাবে, এটা হতে পারে না। যে রেগুলেটরি বোর্ডের সমস্যা, সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। তিনি আরও বলেন, এখানে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে, কাস্টমারদেরও ক্ষতি হয়েছে। তাদের জীবন চলে গেছে। আমাদের শত কোটি টাকা এখানে নষ্ট হয়েছে। আমরা বিডা এবং এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা বিভিন্ন মার্কেটগুলো পরিদর্শন করলাম। সেখানে আমরা দেখলাম কোথাও বিদ্যুতে সমস্যা, কোথাও ফায়ার সেফটির সমস্যা। সমস্যা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এখন ফায়ার সেফটিতে যারা কাজ করেন তারা একসময় ফায়ার সার্ভিসে কাজ করতেন। তারা এখন ফার্ম খুলেছে, এখন একেক মার্কেটে গিয়ে বলছেন ৩/৪/৫ কোটি টাকা লাগবে ফায়ার সেফটির জন্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত বৃহৎ টাকা আমরা কোথায় পাব? সরকার বলেছে ফায়ার সেফটির জন্য বিদেশ থেকে যত মালামাল আসবে সেগুলো ট্যাক্স ফ্রি থাকবে। এটা দেশের মানুষের জন্য করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যখন বিভিন্ন সংস্থার কাছে যাচ্ছি, তখন তারা সেই কাজটি করছে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের সরেজমিন তদারকি করে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজউকের। অথচ পুরো ঢাকা শহরে ভবনের ব্যবহার অনুমোদন রয়েছে গুটিকয় ভবনের। সিটি করপোরেশনও রাজউকের অনুমোদনের দুর্বলতাগুলো বিবেচনায় না রেখেই রেস্টুরেন্ট করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না নিয়ে কীভাবে এই ব্যবসা চলছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ দায় এড়াতে পারে না। এসব গাফিলতি বলে দিচ্ছে, নগর সংস্থাগুলো তাদের ব্যর্থতা এড়াতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights