চাঁদাবাজি বন্ধে কমবে পণ্যের দাম

হাসান ইমন

দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনে কয়েক দশক ধরে চলছে চাঁদাবাজি। তবে বিগত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে এর তীব্রতা ছিল বেশি। পণ্য পরিবহনের সময় প্রতিটি ঘাটে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি। প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হতো এ সেক্টর থেকে। আর এর প্রভাব পড়ত পণ্যের বিক্রয় মূল্যের ওপর। বাড়তি খরচ যুক্ত হয়ে কয়েক গুণ দাম বেড়ে যেত পণ্যের। এখনো চলছে চাঁদাবাজি ও নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট। এ ক্ষেত্রে শুধু চাঁদাবাজদের পরিবর্তন হয়েছে। পণ্য পরিবহনসহ সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ হলে পণ্যের দাম কয়েক গুণ কমে যাবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

গত সাড়ে ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে প্রতিটি সেক্টরে চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে প্রতিটি উপজেলা, জেলা, সিটি করপোরেশনসহ ঘাটে ঘাটে টোল, চাঁদা দিতে হতো এ সিন্ডিকেটদের। চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক ব্যক্তির পরিচয়, নয়তো পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নাম। ট্রাক টার্মিনাল ইজারার নামে আদায় করা হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। টার্মিনালে না দাঁড়িয়ে সড়ক দিয়ে গেলেও দিতে হয় চাঁদা। বিশেষ করে চাঁদা আদায় করতেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ সদস্য, আওয়ামী লীগসহ অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। প্রতিদিন প্রতিটি পণ্যবাহী পরিবহনকে কয়েক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হতো। আর এর প্রভাব পড়ত পণ্যের দামের ওপর। এতে প্রান্তিক পর্যায় থেকে পণ্য ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে যেতে দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। জানা যায়, দেশে প্রতিদিন ৭০ হাজারের বেশি পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে। এর কোনোটিই পুলিশকে চাঁদা না দিয়ে চলতে পারে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একেকটি স্পটে ৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হতো। এ চাঁদা যেমন হাইওয়ে পুলিশ নিত, তেমন মালিক ও শ্রমিক সমিতির নামেও আদায় করা হতো। পণ্যবাহী ট্রাক ট্রাফিক জ্যামে পড়লে একটি গ্রুপ আছে যারা ভাঙচুরের হুমকি দিয়েও চাঁদাবাজি করে থাকে। চালকরা জানান, বগুড়া থেকে ঢাকায় আসতে একটি ট্রাককে অন্তত ১২ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট চাঁদা। গড়ে একটি ট্রাককে কমপক্ষে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হতো। তাদের হিসাবমতে, সারা বাংলাদেশে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান থেকে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করতেন। আর ঈদ বা কোনো উৎসবে এ চাঁদা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। বগুড়া থেকে সবজিবোঝাই ট্রাক নিয়ে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করেন বগুড়া শহরের সুলতানগঞ্জপাড়ার জনি শেখ। তিনি বলেন, ‘আগে যেমন পুলিশ, মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে সড়কে চাঁদা নেওয়া হতো, এখন তা পুরোপুরি বন্ধ। এ কারণে আগের তুলনায় ট্রাক ভাড়াও কমে গেছে।’

রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার। সেখানকার সবজি সরবরাহকারী এক পাইকারি বিক্রেতা রহিম শেখ বলেন, ‘সড়কে পুলিশের এবং বাজারে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের খরচ বেড়ে যেত। এ বাড়তি খরচ পণ্যের ওপর পড়ত। এখন সড়কে পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ হলেও বাজারে চাঁদাবাজি পুরোপুুরি বন্ধ হয়নি।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে প্রতিদিন ৭০ হাজারের বেশি পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল করে। বিগত সরকার আমলে প্রতিটি ঘাটে পুলিশকে চাঁদা দিতে হতো। সব মিলিয়ে প্রতিটি গাড়িকে প্রতিদিন হাজার টাকার বেশি চাঁদা দিতে হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের পট পরিবর্তনের কারণে এখন সড়কে চাঁদাবাজি কিছুটা কমেছে কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শুধু চাঁদাবাজ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখনো আছে সবখানে। এ সিন্ডিকেট ভাঙতে পারলে পণ্যের দাম অনেক কমে যাবে।’

জানতে চাইলে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘রাস্তায় চাঁদাবাজির জন্য বিশেষ করে কাঁচামালের দাম অনেক বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকায় কাঁচামাল আনার সময় নানা জায়গায় চাঁদাবাজি হয়। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা এসব চাঁদা নেন। মূলত ট্রান্সপোর্ট সেক্টরের চাঁদাবাজির বিষয়টি ভয়াবহ, শুধু একটি পয়েন্টে চাঁদা দিলেই হয় না, বিভিন্ন জায়গায় দিতে হয়। এ ছাড়া বাজারভিত্তিক চাঁদাবাজিও হয়। প্রতিটি পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিশেষ ধরনের চাঁদাবাজ গোষ্ঠী রয়েছে। সব চাঁদাবাজি যখন আমরা একত্র করি, তখন দেখা যায় মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়ে যায় ওই পণ্যের ওপর। যদিও সরকার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। শুধু হাতবদল হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এসব সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে পণ্যের দাম কমবে। একই সঙ্গে পণ্যের দাম কমাতে হলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথ অভিযান পরিচালনা করলে পণ্যের দাম কমে যাবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights