নেপথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ এবং সরোয়ার হোসেন বাবলার মধ্যে বিরোধের জের ধরে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার নেপথ্য হোতা হিসেবে উঠে এসেছে কারাবন্দি ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নার নাম। মূলত অপরাধের অন্ধকার জগতের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল এবং সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতার প্রতিশোধ নিতেই হয়েছে জোড়া খুন। বাকলিয়া থানার ওসি ইফতেখার উদ্দিন বলেন, বাবলার সঙ্গে ছোট সাজ্জাদের পুরোনো বিরোধ ছিল। এরপর সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করিয়ে দেওয়ার জের ধরে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড হয়। বুধবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ছোট সাজ্জাদের স্ত্রীসহ বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ নগরীর বায়েজিদ থানার ওসি আরিফ হোসেন বলেন, ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হলেও তার বাহিনীর সদস্যরা কেউ কেউ এখনো সক্রিয় রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত ছোট সাজ্জাদ গ্রুপের ১২ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জানা যায়, গত ১৫ মার্চ রাতে রাজধানীর একটি শপিং কমপ্লেক্স থেকে গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ। তার গ্রেপ্তারের জন্য সাজ্জাদের অনুসারীরা দায়ী করে আসছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে। গ্রেপ্তারের পর সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ হুমকি দিয়ে ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করেন। এরপর গত ২৬ মার্চ সাজ্জাদের নানি রেহেনা বেগমের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। তাতে তিনি বলেন, ‘আগে গোপনে মেরেছি। এখন ওপেন মারব।’ সেই ভিডিও ছড়ানোর দুই দিনের মধ্যে ফিল্মি কায়দায় নগরীর বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড এলাকায় ব্রাশফায়ার করা হয় বাবলাকে বহনকারী প্রাইভেট কারে। যাতে দুজন নিহত এবং আহত হয়েছেন দুজন। পুলিশের দাবি, দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরোধের জের ধরেই হয়েছে জোড়া খুন। কারাগারে বন্দি ছোট সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনায় হয়েছে এ হত্যাকাণ্ড।

সূত্র জানায়, অপরাধের অন্ধকার জগতের আলোচিত মুখ ছোট সাজ্জাদের অপরাধের হাতেখড়ি হয়েছে চট্টগ্রামের আলোচিত শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খানের হাত ধরে। আলোচিত ‘এইট মার্ডার’ মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাজ্জাদ খান বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর সাজ্জাদ হোসেনই ‘সাজ্জাদ বাহিনীর’ একটি অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন তিনি পরিচিতি পান ছোট সাজ্জাদ নামে। সাজ্জাদ বাহিনীর অপর একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। নগরীর বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও হাটহাজারী এলাকায় কেউ নতুন বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসাবাণিজ্য, জমি বেচাকেনা করলেই বিদেশে বসে ফোন করতেন বড় সাজ্জাদ। চাঁদা দিতে গড়িমসি করলে শিষ্য ছোট সাজ্জাদ ও বাবলাকে দিয়ে হামলা করাতেন। কিন্তু ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর সাজ্জাদ তৈরি করেন নিজস্ব বাহিনী। বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। নিজস্ব বাহিনী করার পর বাবলার সঙ্গে তৈরি হয় দূরত্ব। করতে থাকেন একের পর এক খুন ও অপহরণ। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে মাসুদ কায়সার ও মোহাম্মদ আনিসকে হত্যা করেন ছোট সাজ্জাদ। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আফতাব উদ্দিন তাহসীনকে। তিন মাসের মধ্যে প্রকাশ্যে তিনটি খুন আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন সাজ্জাদ। কথায় কথায় গুলি ছোড়াই যেন তার কাছে পরিণত হয়েছে ফ্যাশনে। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর অক্সিজেন মোড়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসে প্রকাশ্যে বায়েজিদ থানার ওসিকে হত্যার হুমকিও দেন। এরপর নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রামের প্রশাসন। তাকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করে সিএমপি। চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, বায়েজিদ এবং জেলার হাটহাজারী থানার বাসিন্দাদের কাছে ছোট সাজ্জাদ বাহিনী পরিণত হয় মূর্তিমান আতঙ্কে। এ এলাকায় দখলবাজি থেকে শুরু করে চাঁদাবাজিসহ সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে এ সন্ত্রাসী বাহিনী। চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল-বেদখল, জুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন ছোট সাজ্জাদ ও বাবলা। এরপর শুরু হয় একে অপরকে ঘায়েলের পরিকল্পনা।

জোড়া খুনের ঘটনার গ্রেপ্তার ২ : নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুনের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী মো. বেলাল এবং ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মো. মানিক। বুধবার রাতে ফটিকছড়ি থানাধীন কাঞ্চননগর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বাকলিয়া থানার ওসি ইফতেখার উদ্দিন বলেন, জোড়া খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সময় ব্যবহার করা টি-শার্ট, প্যান্ট, জুতাসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights