গাজায় ত্রাণ লুটপাটকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে ইসরায়েল!

অনলাইন ডেস্ক
ইসরায়েল হামাসের মোকাবিলায় গাজায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে জাতিসংঘ এবং সাহায্য সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই গোষ্ঠীগুলোকে ত্রাণবাহী ট্রাক থেকে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করার অনুমতি দিচ্ছে।

ইয়ালেন আবু শাবাব-এর নেতৃত্বে ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামে একটি স্বঘোষিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী গাজার দক্ষিণে নবনির্মিত ইসরায়েল-সমর্থিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলো পাহারা দিচ্ছে বলে দাবি করেছে। সাহায্য কর্মীরা বলছেন, এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ট্রাক লুট করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তিশালী গোষ্ঠী বা বর্ধিত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা প্রায়শই অপরাধী চক্র হিসাবে কাজ করে। সাহায্য কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের এই গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার উদ্দেশ্য হলো গাজার সমস্ত সাহায্য কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা। ইসরায়েল অবশ্য তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় লুটপাট চালানোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

গাজায় হামাস-বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী কারা?
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে বলেছেন, ইসরায়েল হামাসের বিরোধিতা করার জন্য গাজার গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করেছে। তবে কীভাবে ইসরায়েল তাদের সমর্থন করছে বা ইসরায়েল তাদের দিয়ে কী ভূমিকা পালন করতে চায়, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য তার এক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগের জবাবে আসে, যিনি তার বিরুদ্ধে গাজায় অপরাধী পরিবারগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

গাজায় গোষ্ঠী, উপজাতি এবং বর্ধিত পরিবারগুলোর শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে, যেখানে তাদের নেতারা প্রায়শই বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তা করেন। কিছু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সশস্ত্র ছিল এবং কিছু গোষ্ঠী মাদক চোরাচালান বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত গ্যাং-এ পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলের পর হামাস এই গ্যাংগুলোকে কঠোর হাতে দমন করে। আবার কখনও বিশেষ সুবিধাও দিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ২০ মাসের যুদ্ধের পর হামাসের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় গ্যাংগুলো আবার স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। আবু শাবাব গোষ্ঠীর সদস্যরা যে গোষ্ঠী থেকে এসেছে, সেটিসহ বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব লুটপাট এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

স্বঘোষিত ‘জাতীয়তাবাদী শক্তি’
আবু শাবাব গোষ্ঠী ছাড়া ইসরায়েল আর কতগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে, তা জানা যায়নি। আবু শাবাব গোষ্ঠী মে মাসের শুরুতে নিজেদের একটি জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসাবে ঘোষণা করে। তারা জানায় যে, তারা ত্রাণ রক্ষা করছে, যার মধ্যে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন পরিচালিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে থাকা ত্রাণও রয়েছে।

আবু শাবাব গোষ্ঠীর মিডিয়া অফিস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছে যে, তারা আমেরিকান সাহায্য সংস্থা সিএইচএফ-এর সঙ্গে সহযোগিতা করছে যাতে খাদ্য ও ঔষধ তার উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়।

যুদ্ধের আগে, ইয়াসের আবু শাবাব মিশর ও ইসরায়েল থেকে গাজায় সীমান্ত ক্রসিং এবং সুড়ঙ্গ দিয়ে সিগারেট ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার আগের গোষ্ঠীর সদস্যরা আরও জানান, হামাস আবু শাবাবকে গ্রেপ্তার করেছিল কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হলে তাকে অন্যান্য বেশিরভাগ বন্দীর সঙ্গে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়।

আবু শাবাবের মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, তাকে যুদ্ধের আগে পুলিশ ডেকেছিল কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত বা বিচার করা হয়নি। এটি আরও বলেছে যে, ত্রাণবাহী ট্রাকে হামলার সঙ্গে গোষ্ঠীর জড়িত থাকার দাবি অতিরঞ্জিত এবং তাদের যোদ্ধারা প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিমাণ খাবার ও পানি নিয়েছিল।

সাহায্য কর্মীরা বলছেন, তারা লুটপাটের জন্য কুখ্যাত
গাজায় সাহায্য গোষ্ঠীগুলোর জন্য ট্রাক ও চালক সরবরাহকারী সমিতির প্রধান নাহেদ শেহেইবার বলেছেন, তাদের সদস্যদের যানবাহন আবু শাবাবের যোদ্ধাদের দ্বারা বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। শেহেইবার বলেন, গোষ্ঠীটি রাফা এবং খান ইউনিসের ইসরায়েলি-নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে, ইসরায়েলের কেরেম শালোম ক্রসিং থেকে গাজায় প্রবেশ করার সময় ট্রাকগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তিনি জানান, কাছাকাছি থাকা সেনারা হামলা বন্ধ করতে কিছুই করেনি।

শেহেইবার আরও বলেন, যখন হামাস পুলিশ সদস্যরা গ্যাংগুলোর মোকাবিলা করার ট্রাক কনভয় পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন তাদের ওপর ইসরায়েলি সেনারা হামলা চালিয়েছে।

চালক ইসাম আবু আউদা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, গত জুলাই মাসে আবু শাবাবের যোদ্ধারা তাকে আক্রমণ করেছিল। তিনি বলেন, যোদ্ধারা তার ট্রাক থামিয়ে তাকে ও তার সহকারীকে চোখ বেঁধে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। তারপর গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে নেয়। আবু আউদা বলেন, কাছাকাছি থাকা ইসরায়েলি সেনারা হস্তক্ষেপ করেনি।

জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয়কারীর জোনাথন হুইটেল বলেছেন, এই ধরনের হামলা এখনও ঘটছে এবং এটি একটি উদ্বেগজনক প্যাটার্ন তুলে ধরেছে। দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য ওসিএইচএ’র অফিসের প্রধান হুইটেল বলেন, যারা ত্রাণবাহী ট্রাক আটকেছে এবং সহিংসভাবে লুট করেছে, তাদের ইসরায়েলি বাহিনী সুরক্ষা’ দিয়েছে বলে মনে হয়। তিনি আরও বলেন, তারা এখন ইসরায়েলের নতুন সামরিকীকরণ করা হাবগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা পণ্যের রক্ষক হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ট্রাক লুঠ করার অনুমতি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই অভিযোগগুলোকে মিথ্যা খবর বলে অভিহিত করে বলেছে। ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় লুটপাটকারীদের কার্যক্রমের অনুমতি দেয়নি। ইসরায়েল প্রায়শই হামাসকে ট্রাক থেকে চুরি করার অভিযোগ করে।

এর সঙ্গে সাহায্যের কী সম্পর্ক?
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ শেহাদা। যিনি ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর একজন ভিজিটিং ফেলোও। তিনি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে ইসরায়েলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার উদ্দেশ্য সরাসরি হামাসের সঙ্গে যুদ্ধ করা।

পরিবর্তে তিনি বলেন, ইসরায়েল এই গ্যাং এবং লুটপাটকে ব্যবহার করছে জিএইচএফকে ফিলিস্তিনিদের কাছে খাবার সরবরাহের একমাত্র বিকল্প হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য, কারণ তাদের সরবরাহ প্রবেশ করছে যখন জাতিসংঘের সরবরাহ ঢুকতে পারছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights