রণক্ষেত্র কাকরাইল, উত্তপ্ত রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির অফিসে গতকাল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপে কাকরাইল ও বিজয়নগর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের পর পুলিশ জাতীয় পার্টির অফিস ঘিরে রাখে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করে গোটা এলাকায়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া বিভাগের রিপোর্টার নাইমুর রহমান দুর্জয় এবং বাংলানিউজের ফটোসাংবাদিক জি এম মজিবরসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতাদের অভিযোগ, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে তাঁদের অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিকালে গণঅধিকার পরিষদ বিজয়নগরে তাদের কার্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি জাতীয় পার্টি অফিসের সামনে গেলে উত্তেজনামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ ছাড়া ‘জুলাই মঞ্চ’ ব্যানারে ১৫-২০ জন বিক্ষোভকারী কিছুক্ষণ পরপর মিছিল নিয়ে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনের রাস্তা প্রদক্ষিণ করেন। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল- ‘জাতীয় পার্টিসহ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের শত্রুদের বিরুদ্ধে হুলিয়া মিছিল’। বিকালে বিক্ষোভকারীদের একটি মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অপর একটি মিছিল জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইসলামী আন্দোলনের মিছিলটি কাকরাইলের দিকে চলে যায়। তবে একদল বিক্ষোভকারী জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁরা পুলিশের বেষ্টনী উপেক্ষা করে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে দিকে এগিয়ে যান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধস্তাধস্তি হয়। বিক্ষুব্ধ মিছিলকারীরা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে গিয়ে ভাঙচুর করতে থাকেন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের নিচতলায় আগুন লাগিয়ে দেন। পুলিশ এ সময় লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ জলকামান দিয়ে আগুন নেভায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ চারটি সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।

এদিন সকাল থেকেই জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয় ঘিরে আছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ। জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরাও কার্যালয়ের ভিতরে ও বাইরে অবস্থান নেন। এর আগে বিকাল ৪টার দিকে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। সংবাদ সম্মেলনে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মশাল মিছিল নিয়ে আমাদের অফিসে হামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। আমাদের নেতা-কর্মীরা সেটা ঠেকিয়েছেন। আমাদের ৩০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের শান্ত করতে গিয়ে তাদের হামলায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আহত হন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। শামীম হায়দার পাটোয়ারীর অভিযোগ, ছয়টি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মবতন্ত্র যদি দমন না হয় তবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে চিন্তা করব। কিন্তু আমরা নরমালি প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচন থেকে জাতীয় পার্টিকে বাদ করে দেওয়ার ইচ্ছা হলো নির্বাচনকেই বাদ করে দেওয়ার ইচ্ছা।’

উত্তাপ রংপুরেও দলীয় কার্যালয় পাহারায় জাপা নেতা-কর্মী : রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর শুক্রবার রাতে আল রাজী টাওয়ারের সামনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের হামলায় গুরুতর আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রংপুরে জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সকাল থেকে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা নগরীর সেন্ট্রাল রোডের দলীয় কার্যালয় পাহারা দেন।

অপরদিকে প্রেস ক্লাব চত্বরে গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। তারা সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নগরীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

শনিবার সকাল থেকে রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডে জাতীয় পার্টির দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা। দুপুরে দলের কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পার্টি দেশের প্রাচীন দল, রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, বিরোধী দলেও ছিল। জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে গেলে ভালো ফল করতে পারবে এমন আশঙ্কায় পরগাছা দলের মাধ্যমে কিছু উসকানিদাতা পেছন থেকে কাজ করছে এবং জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি তুলছে। আজ দেশের আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গুর অবস্থা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কলার চেপে ধরা হচ্ছে। এই লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীনতা ও ভূখ বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তিনি বলেন, আমি পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তারা মব বন্ধ করেছে। এই মব সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশ অস্থিতিশীল হবে এবং আমরা যে নির্বাচনের কথা চিন্তা করছি তা শঙ্কার মধ্যে পড়বে। বর্তমানে জাতীয় পার্টির পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে ঢাকায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দলের নেতা-কর্মীরা। গতকাল দুপুরে প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য হানিফ খান সজীব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদের জেলা সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল রতন প্রমুখ। এ সময় বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মতো পুলিশ এখনো নারকীয় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ভিপি নুর দেশের একজন সাহসের প্রতীক। স্বৈরাচারের দোসরদের রক্ষায় তার ওপর হামলা হয়েছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতারা। নগরীর প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি, সাবেক মুখপাত্র খন্দকার নাহিদ ইসলাম, সংগঠক মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহ শাহ ফকির প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights