সোমালিল্যান্ড কেন হঠাৎ বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে

অনলাইন ডেস্ক
হর্ন অব আফ্রিকা বিশ্বের অন্যতম উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চল নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ছে। তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে স্বঘোষিত রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ড, যা এখন কূটনৈতিক বিতর্ক, কৌশলগত হিসাব এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে আলাদা হয়ে একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও জাতিসংঘসহ কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে স্বীকৃতি দেয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলটি কার্যত স্বীকৃতিহীন অবস্থায় ছিল। তবে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) ইসরায়েলের স্বীকৃতি ঘোষণার পর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এই ঘোষণার পর সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সৌদি আরব স্পষ্ট জানায়, তারা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায় এবং কোনো সমান্তরাল রাষ্ট্রকে গ্রহণ করবে না। মিশরও একই অবস্থান নেয়। তুরস্কের মতে, এই উদ্যোগ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী কূটকৌশল হতে পারে।

কূটনীতিকদের মতে, এই বিতর্ক এখন আর শুধু আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। সৌদি আরব ও মিশরের উদ্বেগের মূল কারণ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণে নতুন শক্তির সম্ভাব্য প্রবেশ।

সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক আগ্রহের অন্যতম কারণ। অঞ্চলটি এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত, যে পথ দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে।

গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেন সংঘাত এবং হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় এই সামুদ্রিক অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সোমালিল্যান্ডকে সম্ভাব্য স্থিতিশীল সামরিক ও নৌঘাঁটির জন্য উপযোগী এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা লোহিত সাগরে কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। অঞ্চলটি নিজেকে সোমালিয়ার তুলনায় বেশি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক হিসেবে উপস্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে তারা বিদেশি বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহায়তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে বলে আশা করছে।

বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। চীন সাধারণত বিদ্যমান রাষ্ট্রসীমার প্রতি অনুগত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো কৌশলগত স্বার্থে সোমালিল্যান্ডে আগ্রহ দেখাচ্ছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়াও আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামরিক সুযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, সোমালিল্যান্ডকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শক্তির একটি নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নয়। শুক্রবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তবে গত আগস্টে হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইঙ্গিত দেন, সোমালিল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে।

অনেকে আশঙ্কা করছেন, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিলে সোমালিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ায় সেনা মোতায়েন রেখেছে, যারা আল শাবাবের বিরুদ্ধে অভিযানে সোমালি বাহিনীকে সহায়তা করছে।

তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে সোমালিল্যান্ডের পক্ষে কথা বলছেন এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর টেড ক্রুজ উল্লেখযোগ্য। তিনি সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন এবং সোমালিল্যান্ড ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে সোচ্চার।

এদিকে, সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ইসরায়েলের ঘোষণার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের মতে, সোমালিল্যান্ড সোমালিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একতরফাভাবে কোনো দেশকে স্বীকৃতি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

সব মিলিয়ে, সোমালিল্যান্ড এখন আর কেবল একটি স্বঘোষিত অঞ্চল নয়। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ, কৌশলগত শক্তির প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি স্পর্শকাতর পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, আনাদোলু এজেন্সি, মডার্ন ডিপ্লোমেসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights