ভেনেজুয়েলায় সাম্রাজ্যবাদের নয়া থাবা, ভয়ংকর যুগে প্রবেশ করছে পৃথিবী?

অনলাইন ডেস্ক
ভেনেজুয়েলা সংকটের এই উত্তাল সময়ে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এবং ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্যবাদী অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারাকাসে মার্কিন সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ অপহরণের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয় বরং এটি বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের এক স্পষ্ট সংকেত। এই ঘটনা প্রমাণ করে এতোদিনের চেনা উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে এবং তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে এক নগ্ন ও সহিংস করপোরেট ফ্যাসিবাদ। কোনো আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ছাড়াই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা সরাসরি জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা ও রাষ্ট্রীয় অপহরণের শামিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা শাসন করবে। তখন গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের মতো পুরনো অজুহাতগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে এখন আর কোনো ছদ্মবেশের প্রয়োজন নেই বরং তেল, কৌশলগত সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে এই অভিযানের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আইনের শাসনের পরিবর্তে গায়ের জোর বা পেশিশক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যেখানে ক্ষমতাধর দেশগুলো এবং তাদের পেছনের বিশাল আর্থিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা পুরো একটি দেশ বা অঞ্চলকে যুদ্ধের লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। যে তরিকায় সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকার একেবারেই গুরুত্বহীন।

ওয়াশিংটন দীর্ঘ দুই দশক ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়েও যখন ব্যর্থ হয়েছে, তখন তারা এই চরম পথ বেছে নিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্র এখানে একটি বড় ধরনের ঐতিহাসিক ভুল করছে। তারা মনে করছে প্রেসিডেন্টকে বন্দি করলেই ভেনেজুয়েলার সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা দেশটির সামরিক ও বেসামরিক ঐক্য সহজে হার মানার মতো নয়। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এবং তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এই ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক আইন এখন কেবল দুর্বল দেশগুলোকে দমানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ওপর কথিত হামলা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের লাগামহীন সামরিক তৎপরতা এবং ইউরোপের নীরবতা; সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এক মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ক্ষয়িষ্ণু শক্তিগুলো এখন চরম বর্বরতার পথ বেছে নিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর এই নতুন ফ্যাসিবাদ কোনো আদর্শের তোয়াক্কা করে না বরং এটি সশস্ত্র করপোরেশন এবং সামরিকায়িত বাজারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্র ও জনগণের নীরবতা কার্যত এই আগ্রাসনকে সমর্থনের শামিল। বর্তমান পরিস্থিতি কেবল ভেনেজুয়েলার ভাগ্য নির্ধারণ করবে না বরং এটি ঠিক করে দেবে যে আগামী বিশ্বের মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা গড়ার অধিকার রাখবে নাকি তারা কেবল কোনো পরাশক্তির পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights