পরিস্থিতি এখন শান্ত থাকলেও অস্ত্র ব্যবহারের শঙ্কা এমপি প্রার্থীদের

কাজী সোহাগ, খুলনা থেকে

এখন পর্যন্ত খুলনার ছয়টি আসনে নির্বাচনি পরিবেশ রয়েছে শান্ত ও শৃঙ্খল। কিন্তু অস্ত্র ব্যবহারে যেকোনো সময় হিসাব পাল্টে যেতে পারে বলে শঙ্কা এখানকার এমপি প্রার্থীদের। তারা বলছেন, খুলনায় অস্ত্রের ছড়াছড়ি। ৫ আগস্টে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। তাই আসন্ন নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে কিংবা নিজেদের মধ্যে অস্ত্রের ব্যবহার খুলনার নির্বাচনি পরিবেশকে যেকোনো সময় উত্তপ্ত করতে পারে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে তিন এমপি প্রার্থীর কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন রাখা হয়। তারা জানান, প্রশাসনকে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। গত এক বছরে খুলনা এলাকায় অর্ধশতাধিক খুন হয়েছে। মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। তাই আসন্ন নির্বাচনে সন্ত্রাসীদের হাতে মজুত থাকা অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি দারুণ শান্ত রয়েছে। আশা করি নির্বাচনেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।

এ প্রসঙ্গে খুলনা-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আপাতত আমার এখানে কোনো শঙ্কা নেই। নির্বাচনি পরিবেশ অনেক চমৎকার। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা খুব ভালোভাবে কাজ করছেন। খুলনায় কোথাও সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেনি। তিনি বলেন, আমাদের শঙ্কা রয়েছে যে, এখানে গত এক বছরে অর্ধশতাধিক খুন হয়েছে। মাদকের প্রসার ঘটেছে। এসব বিষয়ে পুলিশ শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। দুর্বৃত্তরা, অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কারও কারও পক্ষ নিয়ে কিংবা নিজেরাই কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথবা পালানো ফ্যাসিবাদের পক্ষেও তারা যেকোনো সময় এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। পুলিশকে বারবার বলেছি-অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। ব্লক রেইড দেন। আমরা শুনেছি, যৌথ বাহিনী মাঠে নামবে। কিন্তু সেটা এখন পর্যন্ত ঘোষণাতেই রয়ে গেছে। তাই এখানে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জটা এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটারদের আশ্বস্ত করা ও তাদের নিরাপদ রাখতে পারলেই কেবল খুলনায় ভোট উৎসব সম্ভব। খুলনা- ১ আসনের আরেক বিএনপি প্রার্থী আমির এজাজ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ আপাতত শান্ত মনে হলেও যেকোনো সময় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ভোটে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। আমার যেমন আশঙ্কা রয়েছে তেমনি ভোটারদেরও শঙ্কা রয়েছে। আমার নির্বাচনি এলাকার অনেক ভোটার বলেছেন- আপনাকে আমরা ভোট দেব কিন্তু সেই ভোট আপনি বুঝে নিতে পারবেন তো? এটাই আসলে আমার কাছে মূল বার্তা বলে মনে হয়েছে।

খুলনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত আলোচিত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভোট মানে একদিকে যেমন উৎসব অন্যদিকে শঙ্কাও থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। এরই মধ্যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমাদের কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করেছেন। এ পরিস্থিতির উত্তরণ আমার কাছে মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার হবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। এজন্য সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে দমন করে রাখতে হবে প্রশাসনকে।

প্রার্থীদের এ ধরনের শঙ্কা প্রসঙ্গে খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যত ধরনের কৌশল নেওয়া দরকার, সেগুলো নিচ্ছি। এতে আমরা কিছুটা সফলও হয়েছি। শুধু এতটুকু আশ্বস্ত করতে চাই প্রার্থীরা কিংবা সাধারণ জনগণ যে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে সেটা আশা করি থাকবে না। খুলনার ছয়টি আসনের ভোটাররা জানান, পুলিশের লুট হওয়া বৈধ অস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়ার এক বছর পর গত ১০ আগস্ট অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন লাভ হয়নি। উল্টো আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি বাড়ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র খুলনার নির্বাচনি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শন এবং অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ ছয়টি আসনে ১২টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ এমপি হিসেবে পেয়েছে ৪২ জনকে। বিএনপি পেয়েছে ১৫ জনকে। জাতীয় পার্টি পেয়েছে ৮ জনকে ও জামায়াত পেয়েছে তিনজনকে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরাও খুলনার আসন থেকে নির্বাচন করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights