দোহাই প্রধানমন্ত্রী গরিবদের বাঁচান
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কারও কারও জন্য অপয়া বলে বিবেচিত হলেও দেশের সিংহভাগ মানুষের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। এ নির্বাচনের বদৌলতে দেশের মানুষ অনির্বাচিত সরকারের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে শপথ নিয়েছে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার। এ সরকারের সবাইকে উষ্ণ অভিনন্দন।
দুনিয়াজুড়ে আনলাকি থার্টিন বা ১৩ সংখ্যাটি দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যা ‘ট্রিস্কাইভেকা ফোবিয়া’ বলে চিহ্নিত। পশ্চিমা বন্ধুদের ভাবসাবে মনে হয়, তাঁরা নিজেদের কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে বলেই ভাবেন। অথচ আনলাকি থার্টিনের উদ্ভব তাঁদের সমাজে। এই একাবিংশ শতাব্দীতেও কুসংস্কারটি দাপট দেখিয়ে চলছে দুনিয়াজুড়ে। কারণ এর উৎসমূলে রয়েছে ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক। মহাপুরুষ যিশুখ্রিস্ট বা ঈসা (আ.) সম্পর্কিত এক কাহিনি। বলা হয়ে থাকে এই মহাপুরুষের শেষ নৈশভোজে ১৩তম ব্যক্তি হিসেবে হাজির হন শিষ্য জুডাস। যিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেন যিশুর সঙ্গে। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে জেরুজালেমের রোমান গভর্নর রাজদ্রোহের অভিযোগে যিশুকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। সে সময় তাঁকে ধরিয়ে দেয় তাঁরই এক শিষ্য জুডাস। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, যিশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়। প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রাণ হারান তিনি। যে কারণে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ১৩ সংখ্যাটি খুবই অপয়া। ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক হোটেলে ১৩ নম্বরের কোনো রুম নেই। এমনকি অনেক হাসপাতালে নেই ১৩ নম্বরের সিট।
সুমন পালিতপশ্চিমাদের দৃষ্টিতে আনলাকি হলেও ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেশবাসী লাকি থার্টিন হিসেবে গ্রহণ করেছে। প্রথমত, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জয় ঘোষণা করেছে। ‘মব জাস্টিস’ ও ‘শাউয়া পূজারি’দের দৌরাত্ম্য থামিয়েছে। তাদের গডফাদারদের প্রত্যাখ্যান করেছে ভোটাররা। প্রত্যাখ্যান করেছে বেহেশতের টিকিট বিক্রেতাদের। গুপ্ত ও সুপ্তদের জন্যও আনলাকি হয়ে উঠেছিল ১৩তম সংসদ নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচন অথর্ব অনির্বাচিত সরকারের কবল থেকে দেশবাসীকে রেহাই দিয়েছে। যারা বিদেশের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসে শেখ হাসিনার আমলেই। এ ক্ষেত্রে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে আমেরিকা ও তার সহযোগী পশ্চিমা দেশগুলো। দেশের অভ্যন্তরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে পরজীবী একটি সম্প্রদায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ‘হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা’ বুলিই শুধু ছাড়া হয়েছে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়নি। উপরন্তু দেশবাসীর অজান্তে ২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে। দেশবিশেষের মদতে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের করিডর দেওয়ার পথেও হাঁটতে চেয়েছিল অথর্ব সরকার। চারদিকের বিরোধিতার মুখে সেটি সম্ভব হয়নি। বিদায়ি সরকার মুখে ভারত বিরোধিতার স্লোগান তুলেছে তারস্বরে। সে স্লোগানের আড়ালে বাংলাদেশকে চীনের বিপক্ষে দাঁড় করানোরও চেষ্টা চলেছে।
নতুন সরকারের সামনে দেশের অর্থনীতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষমাণ। এই চ্যালেঞ্জে তাদের জিততেই হবে। এ ক্ষেত্রে হারার কোনো সুযোগ নেই। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ দেশে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার। দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। গত দেড় বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার বদলে কমেছে। লাখ লাখ মানুষ বেকারত্বের শিকার হয়েছে। এ অবস্থা পাল্টাতে নতুন সরকারকে সক্রিয় হতে হবে।
দেশের স্বার্থেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আগের তিনটা নির্বাচনের মতোই অংশগ্রহণমূলক হয়নি। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। তবে দলটি নিজেদের স্বার্থেই নির্বাচন বর্জনের ডাকও দেয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সিংহভাগ ভোট পড়েছে ধানের শীষের পক্ষে। এমনকি গোপালগঞ্জের তিনটি আসনও পেয়েছে তারা। সেখানে নৌকা ছাড়া অন্য প্রতীকের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বিএনপি সরকারের জন্য নৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই বিএনপি কোনো দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের যেসব মন্ত্রী ও নেতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, আদালতই তাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। ব্যক্তির দায় দলের ওপর চাপানোর পক্ষে নয় বিএনপি। এ ব্যাপারে তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
॥ যে প্রশ্নের জবাব নেই ॥
১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের একটিতে প্রার্থী মারা যাওয়ায় নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। আইনগত জটিলতায় দুইটি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২১২ আসন পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামী জয়ী হয়েছে ৬৮ আসনে। এনসিপি ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ ও খেলাফত মজলিসের একটিসহ জামায়াত জোটের আসনসংখ্যা ৭৭টি। ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে একটি। স্বতন্ত্র সদস্যরা জিতেছেন সাতটি আসনে।
বাংলাদেশে নির্বাচনের রায় মেনে নেওয়ার মানসিকতার ঘাটতি প্রকট। সভ্য দেশগুলোতে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়। প্রতিবেশী ভারতেও একই ব্যবস্থা। সেখানে নির্বাচন হয় প্রায় মাসজুড়ে। ভোট গ্রহণের বেশ কয়েক দিন পরে ভোট গণনা হলেও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। বাংলাদেশে ভোট গ্রহণের পরপরই ভোট গণনা হয়। কিন্তু ফলাফল যা-ই হোক তা নিয়ে প্রশ্ন করা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বছর জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো রেকর্ড করেছে। বাংলাদেশে তারা প্রতিপক্ষের কাছে পাকিস্তানপন্থি দল হিসেবে পরিচিত। অথচ পাকিস্তানে জামায়াত এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশে তারা সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেখিয়েছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। সে বছর তারা পেয়েছিল ১৮টি আসন। এবার তারা যে ৭৭টি আসন পেয়েছে তা আকাশছোঁয়ার মতো। কিন্তু দল ও জোটগতভাবে জামায়াতের অভিযোগ ৩০টি আসনে তাদের ঠকানো হয়েছে।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, জামায়াত পানি ঘোলার চেষ্টা করছে। নির্বাচনে ৭০টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে জামায়াতের আসন অর্ধেকে নেমে আসত। যে সাতটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন, তাঁদের জয়ের পেছনেও বিএনপি কানেকশন অবদান রেখেছে।
সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক প্রকারান্তরে বিএনপি বা জামায়াত জোট নয়, আওয়ামী লীগকে লাভবান করবে। তাদের আমলে যেনতেনভাবে করা নির্বাচনকেই বৈধতা দেবে। নির্বাচন নিয়ে অযথা বিতর্কের আগে বিষয়টি তারা ভেবে দেখলেই ভালো করবেন।
চাই ঋণ সালিশি আইন
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তিনি তাঁর নির্বাচনি মেনিফেস্টোয় গরিববান্ধব নানা পদক্ষেপের কথা বলেছেন। দিয়েছেন গরিবদের স্মার্ট কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। দেশের অভাবী মানুষদের জন্য তাঁর এই ইতিবাচক কর্মসূচি প্রশংসার দাবিদার। তারপরও নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের অন্তত ২ কোটি মানুষকে বাঁচানোর একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়ার আবেদন জানাব। যাতে সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না বললেই চলে। অনেকেরই জানা, সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলাদেশের সিংহভাগ কৃষক সুদখোর মহাজনদের ঋণের জালে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। ঋণের ফাঁদে পড়ে লাখ লাখ মানুষ হারিয়েছিল তাদের জমিজমাসর্বস্ব। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঋণ সালিশি আইন জারি করে তাদের সে অভিশাপ থেকে মুক্তি দেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে অনেক এগিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দুর্দশাগ্রস্ত জাতি থেকে বাংলাদেশ এখন ২০০টি দেশের মধ্যে ৩৫তম অর্থনীতি। তবে একই সময়ে ক্ষুদ্রঋণের জাঁতাকলে দেশের কয়েক কোটি মানুষ নির্মম শোষণে পিষ্ট হচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি দিতে না পারার অপমান থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ীদের আচরণ উইলিয়াম শেকসপিয়ারের কমেডি নাটক ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর সুদখোর ইহুদি মহাজন সাইলকের মতোই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সুদখোর ইহুদি ব্যবসায়ী কিস্তি দিতে না পারা অভাবী মানুষের শরীর থেকে মাংস কেটে নেওয়ার মনোভাবও জাহির করতেন। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ শোধ করতে না পারায় ঘরের টিন খুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। বর্তমানে মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে প্রায় ২৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে, যা প্রচলিত ব্যাংকঋণের সুদের প্রায় দ্বিগুণ। অতীতে এসব প্রতিষ্ঠানের সুদের হার ছিল ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০১০ সালে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি সুদের সর্বোচ্চ হার ২৭ শতাংশে নামিয়ে আনে। পরে ২০১৯ সালে তা আরও কমিয়ে ২৪ শতাংশ করা হয়। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে এই হার এখনো ঋণগ্রহীতাদের জন্য অতিরিক্ত। ক্ষুদ্রঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বিএনপি সরকার উদ্যোগ নেবে এমনটিই আশা করতে চাই। ক্ষুদ্রঋণের জাল থেকে মুক্তি দিতে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো তারেক রহমানও গরিব মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পাবেন।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : sumonpalit@gmail.com
