বঙ্গোপসাগর ঘিরে জটিল ভূ-রাজনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি

বঙ্গোপসাগর নামের মধ্যেই এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক অর্থ নিহিত। দক্ষিণ এশিয়ার এই নীল জলরাশি শুধু বাংলাদেশের নয়, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতামূলক উপস্থিতি এই বঙ্গোপসাগরকে এক ধরনের কৌশলগত সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত করেছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ ভুল একটি পদক্ষেপ বাংলাদেশকে শক্তির প্রতিযোগিতার ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিতে পারে। আবার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির দিগন্ত।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান ‘দি ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার’ (১৮৯৭) শিরোনামে একটি গ্রন্থ লেখেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক; সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে খনিজ সম্পদের সঠিক আহরণ ও ব্যবহার বাংলাদেশকে আগামী দিনের এনার্জি সুপারপাওয়ারে পরিণত করবে।

মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগের তথ্য মতে, অগভীর সমুদ্রে ৮.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং সাগরক্ষেত্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের কথা জানা যায়। বঙ্গোপসাগরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’, যেখানে বিরল জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র, জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার; বিশাল এই জলভাণ্ডারে রয়েছে মৎস্যসম্পদের প্রাচুর্য। এখানেও খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া ১৩ রকমের খনিজ দ্রব্যসহ খনিজ বালুর আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়। প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ছয় লাখ টন মাছ আহরণ করে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ।

বিশ্বের দীর্ঘতম অখণ্ড সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসমৃদ্ধ প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।

বঙ্গোপসাগরে মজুদ খনিজ সম্পদের কৌশলগত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মৎস্যসম্পদ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বৈদেশিক রপ্তানি আয়ে অবদান রাখতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন ও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় এক ধরনের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সিমেন্ট উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বঙ্গোপসাগরের সীমারেখা শুধু কক্সবাজার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এটা শ্রীলঙ্কার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। সমুদ্রপথে আমাদের প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। বিদেশের সাড়ে চার হাজার জাহাজ বাংলাদেশে এই আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন করে।

সাম্প্রতিক সময়ে কোনো কোনো দেশ চাইছে বঙ্গোপসাগরে তাদের সামরিক আধিপত্য বাড়াতে। এর ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশের বিপদ বাড়তে পারে। কারণ ওই দেশগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢালাওভাবে কোনো প্রস্তাবে রাজি হওয়াটা দেশের অর্থনীতির পক্ষেও বিপজ্জনক। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়।

সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (আইএমএফ) থেকে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। অর্থের জন্য কোনো বিশেষ দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় এই ঋণ পেতে অসুবিধা হতে পারে। শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের দৃষ্টান্তও আছে আমাদের সামনে। তাই একটা দেশকে ক্ষুব্ধ করে অন্য দেশকে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিলে তা বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো দেশ বিনিয়োগ, সংযোগ, ঋণ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এখন বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছে। আওয়ামী লীগ সরকার ওই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল বলে বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে প্রকট রোহিঙ্গা সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চল ঘিরে যেকোনো সংযোগ প্রস্তাবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

দেশের আর্থিক বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ খুবই জরুরি। কিন্তু বিনিয়োগ হতে হবে দেশের স্বার্থে। তা না হলে বাড়বে ঝুঁকি। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কথা মাথায় রেখেই আমাদের বিদেশি বিনিয়োগের নীতি হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। দেশের স্বার্থকেই দিতে হবে অগ্রাধিকার।

১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিনসহ নিজেদের নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিয়েছে পাকিস্তান। চীন থেকে সংগৃহীত নতুন হ্যাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন পিএনএস হ্যাঙ্গরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান নৌবাহিনী, যা বাংলাদেশ ও ভারতের নিকটবর্তী জলসীমায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বজায় রেখেছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘কোয়াড অ্যালায়েন্স’—এ দুই কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি রাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবেলা করতে চায়।

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক। বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য; বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা, যেখানে রয়েছে বিশাল মৎস্যসম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও নৌ-বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন সমুদ্রপথে হয় এবং তার একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা, যাতে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য রাষ্ট্রের আস্থায় আঘাত না করে।

বঙ্গোপসাগর আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগ। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের শক্তি তার নিরপেক্ষতা ও বাস্তববাদী কূটনীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights