ভাষা বাঁচাতে অভিনব উদ্যোগ
জয়শ্রী ভাদুড়ী
কোনো ভাষার মুদ্রণ ইতিহাস বা বইপত্রের ধারাবাহিকতা না থাকলে সেটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোও এ চক্র থেকে বাদ যায়নি। শত বছরের পুরোনো বইপত্র হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে সে ভাষায় সাহিত্যচর্চা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে কাজ করছে ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব। তারা ভাষার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করছে, যাতে হারানো সম্পদ আবার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। ভাষা বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি ভাষা শুধু মুখে বলা শব্দের সমষ্টি নয়, তার লিখিত রূপই সেই ভাষার দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের ভিত্তি। অভিধান, ব্যাকরণ, গান, ধর্মীয় অনুবাদ, গল্প, উপন্যাস, পত্রিকা বা শিক্ষামূলক বই এসবই একটি ভাষার স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম। একটি ভাষার প্রথম মুদ্রিত বই মানে সেই ভাষার আত্মপ্রকাশের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেই বইগুলোই প্রমাণ করে যে, ভাষাটি শুধু কথ্য নয়, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য এবং চিন্তার ভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাংলা ভাষা তার দীর্ঘ মুদ্রণ ইতিহাসের মাধ্যমে শক্তিশালী সাহিত্য ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষার ক্ষেত্রেও শত বছরের বেশি সময়ের প্রকাশনার ইতিহাস রয়েছে। সাঁওতালি, খাসিয়া, গারো, মারমা ও অন্যান্য ভাষায় উনিশ ও বিশ শতকে অভিধান, ব্যাকরণ গ্রন্থ, ধর্মীয় অনুবাদ, লোকসংগীতের সংগ্রহ এবং শিক্ষামূলক বই প্রকাশিত হয়েছিল। এসব প্রকাশনা শুধু শব্দের সংকলন নয়; এগুলো ছিল একটি ভাষার বিকাশ, সেই ভাষাভাষী মানুষের জ্ঞানচর্চা এবং সামাজিক ইতিহাসের প্রতিফলন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। অনেক বই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা হারিয়ে গেছে। আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় বর্তমান প্রজন্ম এ ভাষার লিখিত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লেখালেখির ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার সাহিত্যচর্চা অজানা হয়ে যাচ্ছে। ফলে এ ভাষাগুলো শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারে নয়, শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এমনকি সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও পিছিয়ে পড়ছে। এ বাস্তবতায় দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর ঐতিহাসিক বইপত্র ডিজিটাইজ করার এবং মুদ্রণ ইতিহাসকে সামনে আনার দায়িত্ব নিয়েছে কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব। দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী তরুণদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নিভৃতে কাজ করে চলেছে। তাদের লক্ষ্য শুধু ভাষা সংরক্ষণ নয়, বরং ভাষার সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস, জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে ভবিষ্যতের জন্য টিকিয়ে রাখা। এ প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা সমর এম সরেন বলেন, ‘দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষাগুলোর মুদ্রণ ইতিহাস হারিয়ে গেলে শুধু বই বা শব্দ নয়, আমাদের পরিচয়, ইতিহাস এবং জ্ঞানচর্চার একটি বড় অংশ হারিয়ে যাবে।’ তিনি বর্তমানে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক (আইডিআইএল)-এর গ্লোবাল টাস্কফোর্সে দেশের বিপন্ন ভাষাগুলোর ডিজিটাল ইকুয়ালিটির প্রতিনিধিত্ব করছেন। ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব ইতোমধ্যে সাঁওতালি ও খাসিয়া ভাষার প্রায় ১৫ হাজার বইয়ের ইমেজ সংগ্রহ করেছে। এসব বই ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পাশাপাশি মারমা ও গারো ভাষার নথিপত্রের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ উদ্যোগ ব্রিটিশ লাইব্রেরির এন্ডেজার্ড আর্কাইভ প্রোগ্রামের সঙ্গে আর্কাইভাল পার্টনার হিসেবে কাজ করেছে ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব। এতে গত বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব কালচারাল টেস্কট অ্যান্ড রেকর্ডসের গবেষকরাও কাজ করেছেন। এ প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশে ১৮৯০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সাঁওতালি ভাষায় প্রকাশিত কয়েক হাজার বই, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র এবং ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। এ সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে সাঁওতালি ভাষার প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থ, শত বছরের পুরোনো সান্তালি গান ও সংগীতের নোটেশন, প্রথম সাঁওতালি বাইবেলের অনুবাদ, ব্রিটিশ সময়ে সাঁওতালিতে লেখা পাণ্ডুলিপি, সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কিত দলিল, অভিধান, প্রকাশকদের চিঠিপত্র, লোকসংস্কৃতি, লোকজ চিকিৎসা ও ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক অসংখ্য বই। ডিজিটাইজেশনের সময়ে শুধু বই নয়, ভাষার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদানও সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোনো মুদ্রণযন্ত্রের ছাঁচ, টাইপ রাইটার, অডিও ক্যাসেট, হাতে আঁকা চিত্র, লিথোগ্রাফ, ফিল্ম টেপ এবং ঐতিহাসিক ছবি। এসব উপাদান একটি ভাষার প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। সমর এম সরেন বলেন, ‘একটি ভাষাকে ডিজিটাল জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু বর্তমানের ভাষা ব্যবহার নয়, ঐতিহাসিক টেক্সটও প্রয়োজন। ওসিআর, মেশিন ট্রান্সলেশন বা স্পিচ-টু-টেক্সট প্রযুক্তির জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা থাকা বাধ্যতামূলক। এ বইগুলো সেই ভিত্তি তৈরি করে।’ ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব শুধু ভাষা সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা ভাষার সঙ্গে জড়িত সংস্কৃতি, জ্ঞান ও পরিচয়ও সংরক্ষণ করছে। তারা ইতোমধ্যে বিপন্ন ভাষার অভিধান, ভাষা করপাস, ইউনিকোড টাইপিং টুল, স্পেল চেকার এবং অডিও-ভিজুয়াল আর্কাইভ তৈরি করছে। প্রতিটি নথি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা নিশ্চিত করছে, ভাষার মালিকানা সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির হাতে থাকবে এবং ভাষাসম্পদ উন্মুক্ত ও নৈতিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী হবে। তাদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষাভাষী তরুণরা। গুগল ট্রান্সলেশন এবং গুগল লেন্সে সাঁওতালি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করতেও নেতৃত্ব দিয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটি। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদিবাসী ভাষাগুলোকে ডিজিটাল জগতে সক্রিয় করার জন্যও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তাদের বিপন্ন ভাষা সুরক্ষার এ প্ল্যাটফর্মটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৫ সালে ফ্রান্সে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ল্যাঙ্গুয়েজ টেকনোলজি ফর অল সম্মেলনে বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষাগুলোর পক্ষে ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করেছে। সমর এম সরেন সেখানে ভাষানীতিবিষয়ক ইন্টারন্যাশনাল অনারারি অ্যাডভাইজার হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাবের ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাশরুর ইমতিয়াজ। তিনি বলেন, ‘বিপন্ন ভাষা রক্ষার মতো কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগগুলোকে দেশে এখনো যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিপন্ন ভাষা রক্ষায় নৃগোষ্ঠীর ভাষাভাষীদের অন্তর্ভুক্ত না করলে সেই উদ্যোগ যথাযথ হবে না। এমনকি যদি এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েও থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভাষাবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে তা মাঝপথে থেমে যায়। এসব সীমাবদ্ধতা সামলেই ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাব যেমন কমিউনিটিভিত্তিক ভাষা-প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ভাষা সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা একই সঙ্গে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর আদিবাসী ভাষাগুলোকে শুধু ডেটা হিসেবে দেখার প্রবণতাকে চিহ্নিত করে, সেই ভাষাগুলোর ডেটার মালিকানা, ওপেন-সোর্স ভিত্তি শেয়ারিং, মাল্টিমিডিয়া এবং মাল্টিমোডালিটিভিত্তিক ওয়েব প্ল্যাটফর্ম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য সব কাজ করে যাচ্ছে নিজের মতো। এসব ভাষার পুরোনো নথিপত্র ডিজিটাইজ করার মাধ্যমে কমিউনিটির কাছে তাদের ভাষিক সম্পদের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা তুলে ধরছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের একত্রে কাজের মাধ্যমে। সান্তালি ভাষাসহ অন্যান্য বিপন্ন ভাষার ভাষিক-গোষ্ঠীর আত্মপরিচয় নিয়ে গর্ব হওয়ার কাজটি যেভাবে করছে ল্যাঙ্গয়েজ রিসোর্স হাব, সেটা অনুসরণীয়।’
