নতুন বাণিজ্য জোটে বাংলাদেশ

রুকনুজ্জামান অঞ্জন
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ। এ বছরই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়ার কথা। এটি হলে উন্নত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানিতে আর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ। পরিবর্তিত এই বিশ্ব ব্যবস্থায় সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যিক চুক্তি (পিটিএ) করার তাগিদও দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন তিনটি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রতি এক সভা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। ওই সভায় এসব বাণিজ্যিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পক্ষে মতামত তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ তিন সংস্থার প্রতিনিধিরা বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে একটি টাইমফ্রেমও তুলে ধরেন। সেই টাইমফ্রেম অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ১৮০ দিনের মধ্যে পিটিএ চুক্তি সম্পন্ন, ইইউর সঙ্গে চলতি বছর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)-এর আলোচনা শুরু করে ২০২৮ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন এবং চীনের বাণিজ্যিক জোট আরসিইপিতে চলতি বছরের মধ্যে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়াকে পঞ্চম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বিডা, বেজা ও পিপিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, কোরিয়া বাংলাদেশের শীর্ষ দশ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকারী (এফডিআই)-এর একটি। দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করা হলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও বাড়বে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএর সম্ভাব্যতা তুলে ধরে বাংলাদেশের আগ্রহপত্র পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয় সংস্থা তিনটির পক্ষ থেকে। এ ছাড়া চীনের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক জোট আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিডা, বেজা ও পিপিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, এই জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো বৈশ্বিক জিডিপির ৩০ শতাংশ ধারণ করে। এই জোটে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে পারলে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক উৎপাদন হাবে বাংলাদেশ অংশীদার হতে পারবে বলে জানানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরিয়া, ইইউ এবং আরসিইপি এই তিনটি বাণিজ্যিক অংশীদারিকেই বাংলাদেশের জন্য এখন সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগেও এসব জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে- তবে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও ভিয়েতনাম এরই মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে ইইউর সঙ্গে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। ২০২৫ সালে ইইউর তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ২১.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ইইউতে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংস্থা তিনটি মনে করছে, ইইউ-এর সঙ্গে এখনি বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা শুরু না করলে রপ্তানি খাতে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আসিয়ান জোটসহ ১৪টি দেশের সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। এতে আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ ছাড়াও রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। এই চুক্তির ফলে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নামে যে বাণিজ্য জোট গঠিত হয়েছে তার অর্থনীতির আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রতিযোগী রাষ্ট্র ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো এই চুক্তিতে থাকায় তারা রপ্তানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। এ ধরনের একটি বাণিজ্যিক জোটে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারলে এটি শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতাই বাড়াবে না, পাশাপাশি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও বাণিজ্য উদারীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights