রফিকুল হয়ে গেলেন রব স্টিভেন
ইমরান চৌধুরী
আইনের চোখ ফাঁকি দিতে বিদেশি নাম ব্যবহার করে কোম্পানি খুলে সরকারি প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বাংলামার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কাগজেকলমে কোম্পানিটির মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘রব স্টিভেন’ নামে একজনকে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই নামে বাস্তবে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। ওই ব্যক্তি আসলে বাংলামার্কের প্রকৃত মালিক মো. রফিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া এই পরিচয়ের আড়ালেই সরকারি প্রকল্পে বড় অঙ্কের জালিয়াতি করেছেন বাংলামার্কের মালিক। এমনকি এই ভুয়া পরিচয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। তদন্তে জানা গেছে, পরিকল্পিতভাবেই ‘রব স্টিভেন’ নামটি তৈরি করা হয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি দেখিয়ে কৃষিযন্ত্র আমদানি ও সরকারি প্রকল্পে সরবরাহের সুবিধা নিতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। বাংলামার্ক গ্রুপের ফেসবুক পেজসহ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই ব্যক্তি ভিন্ন দুই নামে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। বিভিন্ন সময় সরকারি অনুষ্ঠানেও বাংলামার্কের কর্ণধার হিসেবে রফিকুল ইসলামকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী রফিকুল ইসলামের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগর গ্রামে। ১৯৮৫ সালে জন্ম নেওয়া রফিকুল অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রায় এক যুগ তিনি সরকারি প্রকল্পে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই তার ব্যবসা বিস্তারের পথ তৈরি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলামার্কের দাবি অনুযায়ী, তারা মালয়েশিয়ার মার্কসান নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কৃষিযন্ত্র আমদানি করেছে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। তদন্তে দেখা গেছে, বাংলামার্কের কর্মকর্তা ইরফান উদ্দিন ভিকিকে ওই মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা পেতেই এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে। ইরফান উদ্দিন ভিকির বাড়িও চট্টগ্রামে। তার পারিবারিক নাম ইরফান বিন নূর হলেও বাংলামার্কে তিনি ইরফান ভিকি নামে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইরফান উদ্দিন ভিকি। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মার্কসান নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি জড়িত নই। মালয়েশিয়ায় আমি কখনো যাইনি। ওই দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে স্বাক্ষর করার প্রশ্নই আসে না। যে প্রকল্প নিয়ে এত আলোচনা, সেটির সঙ্গেও আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রব স্টিভেন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের মালিক। তবে এই নামে প্রতিষ্ঠানের কোনো লেনদেন হয় না। সব কিছু তার প্রকৃত নামেই পরিচালিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি মন্ত্রণালয়ে নতুন যোগ দিয়েছি। অতীত বা বর্তমানের যেকোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই আমার লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প সরকারের একটি বড় উদ্যোগ ছিল। গরিব কৃষকরাও রক্ত-ঘামের টাকা দিয়ে যন্ত্র কিনেছেন। জালিয়াতি হয়ে থাকলে অবশ্যই দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে ২০২০ সালে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ চালু করে সরকার। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের কৃষিযন্ত্র কেনার জন্য হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। সারা দেশে ১২ ধরনের মোট ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে একটি কম্বাইন হারভেস্টারের দাম ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর থেকেই যন্ত্র সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে যে পরিমাণ কৃষিযন্ত্র আমদানি করা হয়েছে, কাগজেকলমে কৃষকের কাছে সরবরাহ দেখানো হয়েছে তার চেয়ে ২ হাজার ৫৮৫টি বেশি। ভুয়া তথ্য দেখিয়ে এভাবে ভর্তুকির ৫১৭ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই যন্ত্র একাধিকবার বিক্রি দেখিয়ে ৮৫২টি ভুয়া বিল তৈরি করে অতিরিক্ত ভর্তুকি নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।ক্রয় করা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক কৃষিযন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল কম্বাইন হার্ভেস্টার। আর এখানেই সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তথ্য বলছে, কম্বাইন হার্ভেস্টার বিতরণে কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে সরকারি অর্থ তুলে নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। বাজারমূল্যের চেয়ে যন্ত্রটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে অনেক বেশি। এ ছাড়া অনুমোদিত যন্ত্রের বাইরে নিম্নমানের যন্ত্র আমদানি, চেসিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বরের জালিয়াতি, ৫০ শতাংশ ভর্তুকির জায়গায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি উত্তোলন করেছে কম্বাইন হার্ভেস্টার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই প্রকল্পে বাংলামার্কসহ ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সরকারি ভর্তুকিতে কৃষকদের কাছে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। কৃষকদের অভিযোগ, তাদেরকে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। এ কারণে তারা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই নিম্নমানের কৃষিযন্ত্রের অধিকাংশই কয়েক মাসের মধ্যে নষ্ট হয়েছে। তবে অনেক কৃষককে এখনো ঋণের ঘানি টানতে হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২১৮ পৃষ্ঠার নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলামার্ক। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও সেখানে এসেছে।
কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) অধীন কৃষি ও পরিবেশ নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলামার্ক গ্রুপের নাম।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ঘটনায় দেশের ছয়টি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদন্তেও দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় ৯ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যাপক অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রকল্পের ভর্তুকি কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
তবে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিল তুলে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এখন দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে। এদিকে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাংলামার্কের পরিচালক রব স্টিভেন ওরফে রফিকুল ইসলাম। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, রব স্টিভেন আমার ডাকনাম। আমি এই নামেই পরিচিত। তবে আমার প্রতিষ্ঠানের সব কাগজপত্র ও লেনদেন আমার প্রকৃত নামেই করা হয়। আর টাকা লোপাটের যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে এসব মিথ্যা অভিযোগ। ওই প্রকল্পে আমার ২০০ কোটি টাকার কাজও ছিল না। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমরা সরবরাহ বেশি দেখিয়ে ৫০০ কোটির বেশি টাকা লোপাট করেছি। এই হিসাব আমরা নিজেরাও মিলাতে পারছি না।’
