ক্রিপ্টোতে ভয়াবহ মাদক কারবার

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশে মাদক কারবারে যুক্ত হয়েছে নতুন ও বিপজ্জনক এক মাত্রা। মাদক ডনেরা কেনাবেচায় প্রচলিত লেনদেন এড়িয়ে ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ফাঁকি দিতে মাদক বেচার টাকাও ‘স্টেকিং’ করছে বিটকয়েন, ইথেরিয়াম এবং মোনেরোর মতো ডিজিটাল মুদ্রা। ডিজিটাল দুনিয়ার মাদক কারবার ঠেকাতে কাজ শুরু করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ অঞ্চলের উপ-পরিচালক মানজুরুল ইসলাম বলেন, ‘মাদক কেনাবেচায় ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এ ধরনের একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস টুল এবং সন্দেহজনক ডিজিটাল লেনদেন ট্র্যাক করা প্রযুক্তি আমাদের নেই। ফলে উন্নত প্রযুক্তির অভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছে না মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে প্রযুক্তিগত উন্নত করা গেলে আরও ভালো সাফল্য পাওয়া যাবে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মৌমিতা পাল বলেন, কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযান দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। যেহেতু ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই, তাই নজরদারির জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। যাতে ডার্ক ওয়েব বা সন্দেহজনক বিদেশি অ্যাপ ব্যবহার করলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে সংস্থাগুলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিয়ানমার ও কক্সবাজারের মাদক মাফিয়ারা প্রথাগত মাদক কেনাবেচার পদ্ধতিতে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তারা ইয়াবা ও আইস বেচাকেনায় ব্যবহার করছে ডিজিটাল দুনিয়াকে। মাদক ডনেরা মূলত ইন্টারনেটের গোপন জগৎ ‘ডার্ক ওয়েব’-এ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাদকের বড় বড় চালান আদান প্রদান করছে। এসব মাদক বিক্রির অর্থ লেনদেনে তারা ব্যবহার করছে বাইনান্স বা ট্রাস্ট ওয়ালেটের মতো প্ল্যাটফর্ম। দিন দিন মাদক সাম্রাজ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি এড়াতেই মূলত এ কৌশল অবলম্বন করছে। ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে সরাসরি ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠিয়ে দেওয়া যায়। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে থাকে না কোনো তথ্য। নেই লেনদেন লিমিট। মুহূর্তের মধ্যে লাখ থেকে শত কোটি টাকা লেনদেন করা যায়। ঝুঁকিহীনভাবে ডিজিটাল এ মুদ্রা বহন করা যায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে। ফলে মাদক বেচাকেনায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। শুধু লেনদেন নয় মাদক কেনাচেনার অর্থ ‘স্টেকিং’ (সঞ্চয়) করছে বিটকয়েন, মোনেরো ও ইথেরিয়ামে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইস ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে সিন্থেটিক মাদক আনার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্যমতে, গত এক বছরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি চক্র শনাক্ত হয়েছে যারা সরাসরি বিটকয়েনের মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড এবং থাইল্যান্ড থেকে মাদক অর্ডার করেছে। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে এলএসডি, আইস এবং ডিওবি। সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নজরদারি এড়াতে এবং ঝুঁকিহীনভাবে অর্থ বহন করতে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে মাদক মাফিয়ারা। তারা ক্রিপ্টোকারেন্সি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্টেকিং (ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট)-এর মতো করে লভ্যাংশও পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights