ইরানে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ২০০ বিলিয়ন ডলার চাইলো পেন্টাগন
অনলাইন ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের খরচ জোগাতে কংগ্রেসের কাছে ২০ হাজার কোটি (২০০ বিলিয়ন) ডলার বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরপ্তর পেন্টাগন। এক সামরিক কর্মকর্তা ও প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এমনটাই জানিয়েছেন। এই অর্থ ইরানের মোট জিডিপি-র প্রায় ৫০ শতাংশ। ইতিমধ্যেই বিতর্কে ঘেরা এই সামরিক অভিযানের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এই বিপুল অঙ্কের প্রস্তাব।
সামরিক সূত্র জানায়, অর্থের এই প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পর্যালোচনার পরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হবে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। এর আগে এ তথ্য প্রকাশ করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, “খারাপ শক্তিকে দমন করতে অর্থের প্রয়োজন হয়ই।”
তিনি আরও জানান, “২০০ বিলিয়ন ডলারের এই হিসাব চূড়ান্ত নয়—এতে পরিবর্তন আসতে পারে।”
ক্যাপিটল হিলে এই বিপুল অর্থের প্রস্তাব ইতোমধ্যেই কিছু মধ্যপন্থী রিপাবলিকান নেতার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যাদের সমর্থন ছাড়া অনুমোদন পাওয়া কঠিন। মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর ও অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির প্রধান সুসান কলিন্স বলেন, “অঙ্কটা আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি, তবে এর বিস্তারিত ব্যয়ের খাত এখনো পরিষ্কার নয়।”
তিনি আরও জানান, এখনো কংগ্রেসে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পৌঁছেনি।
আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মারকাউস্কি বলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থ অনুমোদন পেতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসের সঙ্গে আরও সুসংগঠিত ও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, “শুধু একটি বিল এনে ‘এটা পরিশোধ করুন’ বললে ভবিষ্যতে সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।”
গত সপ্তাহে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংঘাত আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং স্থলবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি—যদিও একই সঙ্গে তিনি দ্রুত অভিযান শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।
এই ২০০ বিলিয়ন ডলার কতদিনের জন্য এবং কোন কোন সামরিক কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই অঙ্ক ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের সামরিক সম্পৃক্ততার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তুলনামূলকভাবে, ২০১৪ সালে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে ১৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় ছিল ৮১৫ বিলিয়ন ডলার। আর কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেনকে সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করেছে প্রায় ১৮৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে এসব যুদ্ধের অর্থ এককালীন অনুমোদিত হয়নি; বরং বিভিন্ন সময় ধাপে ধাপে বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে তা দেওয়া হয়েছে—যা প্রায়ই দীর্ঘ ও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যেই কংগ্রেসে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে। প্রায় সব ডেমোক্র্যাট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত করার পক্ষে, আর অধিকাংশ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে তার কৌশল অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে চান।
কিন্তু ২০০ বিলিয়ন ডলারের মতো বিশাল অর্থের অনুরোধ এই রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
হোয়াইট হাউস নিয়মিতভাবেই কংগ্রেসে বাজেট প্রস্তাব পাঠায়, যা আইনপ্রণেতারা প্রয়োজন অনুযায়ী কমাতে বা বাড়াতে পারেন। প্রশাসনের নীতির সঙ্গে দ্বিমত হলে কংগ্রেস প্রায়ই সেই বাজেটে পরিবর্তন আনে।
এই প্রস্তাবে ডেমোক্র্যাটরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডোনাল্ড এস. বেয়ার জুনিয়র বলেন, “দেশের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মেডিকেইড ও খাদ্য সহায়তায় বড় কাটছাঁট করা হয়েছিল। অথচ এখন একই প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে একটি অযৌক্তিক ও দুর্বল পরিকল্পনার যুদ্ধে ২০০ বিলিয়ন ডলার চাইছে—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন হিকেনলুপার বলেন, “এই বিপুল অর্থ আমাদের নেই। এই টাকা দিয়ে আমরা সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কিংবা প্রতিটি শিশুর জন্য বিনামূল্যে স্কুল মিল চালু করতে পারতাম।”
রিপাবলিকান দলেও এই ব্যয় নিয়ে মতভেদ তীব্র হতে পারে—বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সমর্থক ও বাজেট সংযমপন্থীদের মধ্যে। অতীতে বিদেশে সামরিক ব্যয়ের বিরোধিতা করা অনেক রিপাবলিকান এবার কী অবস্থান নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন এবং হাউস স্পিকার মাইক জনসন এখনো সরাসরি এই প্রস্তাবে সমর্থন দেননি, তবে তারা অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।
জনসন বলেন, “সংখ্যাটি নিশ্চয়ই হঠাৎ নির্ধারণ করা হয়নি—আমরা তা পর্যালোচনা করব। তবে বিশ্ব পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত, তাই প্রতিরক্ষায় যথাযথ অর্থায়ন জরুরি।” থুনের কথায়, “ইরানে চলমান সামরিক অভিযান ব্যয়সাপেক্ষ—এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।”
এই প্রস্তাব ট্রাম্পের আগামী অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, আলজাজিরা
