মধু পানে পটু সিঁদুরে মৌটুসি
নজরুল মৃধা, রংপুর
ফুলে ফুলে নেচে নেচে মধু পান করতে পটু অপূর্ব সৌন্দর্যের ছোট্ট সিঁদুরে মৌটুসি। এরা বাতাসে স্থির থেকে প্রজাপতি, ভ্রমর ও মৌমাছির মতো উড়ে ফুলের মধু পান করে বেড়ায়। কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে, আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। সে কারণে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এ প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা না হলেও এর দেখা মেলা ভার। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, বিশিষ্ট কবি ও লেখক রানা মাসুদ সিঁদুরে মৌটুসির ছবিটি তুলেছেন হবিগঞ্জ থেকে।
পাখিটি সম্পর্কে জানা গেছে, এরা অত্যন্ত চঞ্চল, বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে আলোর ঝিলিকের মতো এ গাছ থেকে ও গাছে, এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে বেড়ায়। পুরুষ পাখি বেশ আমুদে। ফুলের নির্যাস বা মধু পানের জন্য মৌটুসিদের রয়েছে লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু, যা ফুলের ভেতরে ঢুকিয়ে খাঁজকাটা ও রবারের ডগারের মতো জিহ্বা দিয়ে মধু পান করে। নির্যাসের অভাবে ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেতে পারে। ফুলের বোটার ওপর বসে বাদুড়ের মতো ঝুলে পড়ে যেভাবে ফুলের রস চুষে তা দেখতে বেশ লাগে।
সিঁদুরে মৌটুসি সিঁদুরে-লাল মৌটুসি নামেও পরিচিত। ছোট্ট সুদর্শন পাখিটি এ দেশের অন্যতম সুন্দর ও দুর্লভ আবাসিক পাখি। এটি চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাঁদাবনে বিচরণ করে। অনেক সময় গ্রাম ও শহরতলির সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। সিঁদুরে মৌটুসি পুরুষ লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ও মেয়ে ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৮ থেকে ১১ গ্রাম হয়ে থাকে। নিচের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি মাঝারি আকারের। পুরুষ ও মেয়ে পাখির দেহের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের দেহের ওপরটা গাঢ় মেরুন। মাথা নীলাভ-সবুজ, নির্দিষ্ট কোণ থেকে যা চকচকে দেখায়। ঘাড় গাঢ় সবুজ ও পাছা বেগুনি। কালচে গলায় বেগুনি আভা ও বুকে মেরুন ডোরা। দেহের নিচটা সাদাটে। অন্যদিকে, মেয়ে মৌটুসির দেহের ওপরটা জলপাই বা বাদামি। গলা সাদা ও বুক হলদে। লেজের ওপরের পালক-ঢাকনি কালো। চোখের ওপরে একটি হালকা দাগ থাকতে পারে। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখের মণি লালচে। চঞ্চু, পা ও আঙুল কালচে। প্রজাতিভেদে মৌটুসিরা ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রজনন করে। তবে কোনো কোনো প্রজাতি বছরের যে কোনো সময় ডিম-ছানা তুলতে পারে। সিঁদুরে মৌটুসির ছবি তোলার অনুভূতি ব্যক্ত করে রানা মাসুদ বলেন, হবিগঞ্জের সাতছড়িতে এই ছবি তুলেছি। এর সৌন্দর্যের কাছে ক্যাপশন হারিয়ে গেছে। শুধুই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।
