কালোবাজারি নিয়ে সংসদে ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। গতকাল ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তরে তিনি এ কথা বলেন। এদিকে অধিবেশনে একাত্তর বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিসের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জ্বালানি পরিস্থিতির প্রকৃত তথ্য সংসদে তুলে ধরার দাবি জানান।

প্রশ্নোত্তর পর্বে নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা তার প্রশ্নে অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে সংকট নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না এবং মোটরসাইকেলে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে পুনরায় তেল নেওয়া প্রতিরোধ করা হচ্ছে।

জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় চলতি মার্চ ২০২৬ মাসেও সমপরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে এই কৃত্রিম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জনমনে ভীতি ও অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পাম্পে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই।’ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, কৃত্রিম সংকট নিরসনে ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিপিসি কর্তৃক ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। অবৈধ মজুতকারীদের ধরতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। সরকারের যদি কোনো সংকটই না থাকে, তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?’

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সরকার মার্কেট প্লেস রাত ৮টার পরিবর্তে ৭টায় বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অদূরদর্শী। মানুষ কেনাকাটা সাধারণত সন্ধ্যার পরেই করে। এ ছাড়া অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’ রুমিন ফারহানার বক্তব্য চলাকালে সরকার দলের সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন। তারা নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন। তার মধ্যেই বক্তৃতা দিতে থাকেন তিনি। অবশ্য বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই মাইক বন্ধ হয়ে যায়। পরে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের অশুভ ‘অঙ্গভঙ্গি’র নিন্দা জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের সম্মানিত কিছু সদস্যের অশালীন অঙ্গভঙ্গি আমার বিবেকে আঘাত করেছে। আমি চার-পাঁচবার নির্বাচিত হওয়া সদস্যদের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করিনি। এমন আচরণ দুঃখজনক এবং আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। এ ধরনের আচরণ না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

কার্টুন শেয়ারের দায়ে গ্রেপ্তার নিয়ে সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর ক্ষোভ সরকারদলীয় চিফ হুইপের কার্টুন শেয়ার করায় অ্যাকটিভিস্ট এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা কল্পনাও করতে পারিনি, একটি গণ অভ্যুত্থানের পর কার্টুন শেয়ার করায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হবে। আমরা হাসিনার আমলে দেখেছি, কটূক্তি করার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়।’ তবে অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছেন জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, ‘কেবল আমার কার্টুন আঁকার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে তাহলে আমি তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য স্পিকারের মাধ্যমে অনুরোধ করছি।’

গতকাল জাতীয় সংসদের বৈঠকে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিস নিয়ে আলোচনা চলাকালে পয়েন্ট অব অর্ডারে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর বক্তব্যের জবাবে স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী অধিকারের প্রশ্ন (কোশ্চেন অব প্রিভিলেজ) উত্থাপনের জন্য দুই ঘণ্টা আগে নোটিস দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি এটি গুরুত্বসহকারে দেখার আশ্বাস দেন। এরপর স্পিকারের কাছ থেকে ফ্লোর নিয়ে এ বিষয়ে সংসদে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, তাঁর বা সরকারের সমালোচনা করে কার্টুন আঁকার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত। গ্রেপ্তার ব্যক্তির অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে চিফ হুইপ বলেন, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তি কেবল কার্টুন নয়, অন্য কোনো সাইবার অপরাধ বা মানি লন্ডারিংয়ের মতো বিষয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। যদি তিনি কেবল রাজনৈতিক কার্টুন এঁকে থাকেন, তবে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু যদি অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ থাকে, তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’

এর আগে অনির্ধারিত বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সরকারি দলের চিফ হুইপ আমাদের ইনভাইট (নিমন্ত্রণ) করে সংসদে স্যাটায়ার করে বলেছিলেন, খাদ্যতালিকায় তিমি মাছ ও হাঙর রয়েছে। এ নিয়ে করা একটি কার্টুন শেয়ার করায় হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ নিয়ে চিফ হুইপের একজন কর্মী মামলা করেছেন, ২৫ ধারায়। অথচ ২৫ ধারায় রয়েছে, যৌন নির্যাতন করা হলে এ ধারায় মামলা করা হবে। কিন্তু হুইপ মহোদয়ের যে মিমটি শেয়ার করা হয়েছে, সেখানে কোথায় যৌন নির্যাতন করা হয়েছে? এই ধরনের মামলায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় মতকে দমন করার জন্য গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।’

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন এই সংসদে পাস করা হয়েছে। ওই আইনে কার্টুন শেয়ার করার অপরাধে মামলা করার কোনো বিধান নাই। এই প্রশ্নগুলো আমরা কাদের করব, যদি আমাদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দেন?’ সংসদে প্রশ্নোত্তরপর্ব স্থগিত রাখা হচ্ছে। ফলে মন্ত্রীদের জবাবদিহি, সেটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। মৌখিক উত্তর দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, এটি রুলস অব প্রসিডিউরে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights