বড় উদ্যোগ আইএসডির খুদে শিক্ষার্থীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বয়সে ১২ থেকে ১৪, তবুও সামাজিক দায়বদ্ধতায় তারা বড়দেরও অনুপ্রেরণা। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার (আইএসডি) শিক্ষার্থীরা নিজেদের শ্রমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বাড্ডার সাঁতারকুলের পাঁচখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে। তাদের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ে নির্মিত হচ্ছে তিনটি নতুন শৌচাগার।

পাঁচখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে ‘ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন (আইএইচএফ)’-এর তত্ত্বাবধানে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টিতে পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব ছিল। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছিল।

গতকাল দুপুরে আইএসডির শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়টিতে এসে অনুদানের অর্থ তুলে দেয় এবং নিজেরাই শৌচাগার নির্মাণকাজের উদ্বোধনে অংশ নেয়। কেউ রাজমিস্ত্রিদের সহায়তা করেছে, কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হয়েছে- সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে এক অনন্য মানবিক উদ্যোগের উদাহরণ।

শিক্ষার্থীরা জানায়, এ অর্থ তারা বাবা-মায়ের কাছ থেকে নেয়নি; বরং রমজান মাসজুড়ে ছোট ছোট ইভেন্ট, খাবার বিক্রি, শিক্ষা উপকরণ বিক্রি এবং খেলাধুলার আয়োজনের মাধ্যমে নিজেরাই সংগ্রহ করেছে। তাদের বিশ্বাস- ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

গ্রেড-৮ এর শিক্ষার্থী আরিশা আফরোজা সোবহান বলেন, ‘সহপাঠীদের নিয়ে এ উদ্যোগ নিতে পেরে আমরা গর্বিত। নিজেদের প্রচেষ্টায় অর্থ সংগ্রহ করে অন্যদের সাহায্য করতে পারা আমাদের জন্য বড় আনন্দের।’

আরেক শিক্ষার্থী নওশাবা ফেরদৌস বলেন, ‘এ কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন উন্নয়নে অবদান রাখতে পেরে ভালো লাগছে। এর আগে আমরা একটি সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম দিয়েছিলাম।’

আরিজ রহমান নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, তহবিল সংগ্রহে তারা বাসা থেকে রান্না করা খাবার এনে বিক্রি করেছে, রমজানে খেজুর বিক্রি করেছে এবং বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করেছে।

পাঁচখোলা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অতুল চন্দ্র রায় বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এখানে একটি অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ছিল, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেক শিক্ষককেও বাইরে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হতো। আইএসডি শিক্ষার্থীদের এ উদ্যোগ আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।’

আইএসডির শিক্ষক আয়াজ আলম কায়ামী জানান, শিক্ষার্থীদের এ উদ্যোগ তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ। ‘ইন্ডিভিজুয়ালস অ্যান্ড সোসাইটিজ’ বিষয়ের অধীনে তারা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে ক্ষুধামুক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, বৈষম্য হ্রাস এবং অংশীদারত্ব- এ চারটি লক্ষ্যে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের চেষ্টায় সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখছে।

স্কুলটির ক্লাস কো-অর্ডিনেটর চার্লস কুম্বা বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এ কাজের মাধ্যমে তাদের আইবি রিকোয়ারমেন্ট পূরণ করছে ঠিকই, কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চেয়েছি তারা যেন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হতে শেখে। আমরা চাই এই অংশীদারত্ব দীর্ঘস্থায়ী হোক। আগামী ২৮ তারিখে আইএসডির ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা এ স্কুলে কম্পিউটার দান করবে বলে জানান কুম্বা।

১৯৯১ সালে জরাজীর্ণ টিনের ঘর দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পাঁচখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্কুলটি যখন মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে, ঠিক তখনই হানা দেয় করোনা মহামারি। অর্থ সংকটে স্কুলটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ২০২৪ সালে স্কুলটি পরিচালনায় এগিয়ে আসে আইএইচএফ। আইএসডি তাদের সিএএস (ক্রিয়েটিভিটি, অ্যাকটিভিটি অ্যান্ড সার্ভিস) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করে, যার মধ্যে অন্যতম আইএইচএফ। সিএএস কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেয়। পাঁচখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের এ অবদান প্রমাণ করে- সচেতনতা ও সদিচ্ছা থাকলে ছোটরাও বড় পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights