ওপেক ও ওপেক+ কী, সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন এটি থেকে বেরিয়ে গেল?

অনলাইন ডেস্ক

পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ‌‘ওপেক’ (OPEC)। অন্যদিকে ওপেক+ হলো ওপেক সদস্য এবং অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নিয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর গোষ্ঠী। বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের বাজারকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ২০১৬ সালের শেষের দিকে এটি গঠিত হয়েছিল।

মঙ্গলবার ওপেক এবং বৃহত্তর ওপেক+ কাঠামো থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তেলের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের জন্য তৈরি হওয়া এই গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে যাওয়া সর্বশেষ দেশ হলো উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি।

দৈনিক প্রায় ৪৮ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশটি মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে যে, “জাতীয় স্বার্থে” মনোনিবেশ করার জন্য তারা সংস্থাটি ত্যাগ করবে।

এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে।

ওপেক কখন এবং কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন (ওপেক) হলো অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা-ভিত্তিক একটি স্থায়ী, আন্তঃসরকারি সংস্থা। যার উদ্দেশ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পেট্রোলিয়াম নীতিসমূহের সমন্বয় ও একীকরণ করা।

এটি মূলত ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে বাগদাদ সম্মেলনে পাঁচটি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র- ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব এবং ভেনেজুয়েলা দ্বারা গঠিত হয়েছিল।

সেই সময়ে, ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত একদল শক্তিশালী পশ্চিমা তেল কোম্পানি বৈশ্বিক তেলের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করত, যারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত এবং দাম নির্ধারণ করত।

প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা, পেট্রোলিয়াম উৎপাদনকারীদের জন্য ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্য নিশ্চিত করা এবং সেইসাথে ভোক্তা দেশগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা।

ওপেকের বর্তমান ১২টি সদস্য রয়েছে। যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়াও আছে- আলজেরিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নিরক্ষীয় গিনি, গ্যাবন, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, সৌদি আরব এবং ভেনেজুয়েলা।

মঙ্গলবার জারি করা এক বিবৃতি অনুসারে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সদস্যপদ প্রত্যাহার ১ মে থেকে কার্যকর হবে। যার মাধ্যমে ১৯৬৭ সাল থেকে সংস্থাটিতে অবদান রেখে আসা একটি সদস্যের বিদায় ঘটবে।

সংস্থাটি তার সদস্য দেশগুলোর জন্য সম্মত উৎপাদন কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, যারা সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

২০১৬ সাল থেকে ওপেক তার ওপেক+ কাঠামোর মাধ্যমে রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, বাহরাইন, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, ওমান, দক্ষিণ সুদান এবং সুদানের সঙ্গে ও সহযোগিতা করে আসছে, যার ফলে এর উৎপাদন বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন ওপেক এবং ওপেক+ ত্যাগ করল?

সৌদি আরবের পাশাপাশি ওপেক-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতও অন্যতম। সংযুক্ত আরব আমিরাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে, যা সংস্থাটিকে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।

তবে, অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দেশগুলো বাজার সমন্বয়ের জন্য তাদের রিজার্ভ ব্যবহার না করে, তা নগদায়ন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ তাকে ওপেক-এর অন্যান্য সদস্য, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, কারণ সৌদি আরব ইয়েমেন ও অন্যান্য বিষয়ে এর অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়।

এদিকে, আবুধাবি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা জুড়ে নিজের প্রভাব বলয় গড়ে তুলছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে, যাদের সঙ্গে ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছিল।

বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের সময় আক্রমণের শিকার হওয়ার পর, এটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি অনন্য মাধ্যম হিসেবে দেখে।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক ত্যাগকারী প্রথম দেশ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানত উৎপাদন কোটা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইন্দোনেশিয়া, কাতার, ইকুয়েডর, অ্যাঙ্গোলা এবং গ্যাবনসহ অন্যান্য দেশগুলোও সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights