দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবির’ সংঘাতে রূপ নিতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ?
অনলাইন ডেস্ক
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরানও। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায় ইরান। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। একই সঙ্গে ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা।
অবশেষে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়। কিন্তু কোনও চুক্তি হয়নি। পরে ২১ এপ্রিল অনেকটা একতরফাভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে; যা ইরানের আলোচনার প্রস্তাব পেশ করা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে পাকিস্তানের মাধ্যমেই শান্তিচুক্তি চেষ্টা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কোনও স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না। আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবরোধ অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী স্থবির কিন্তু অমীমাংসিত যুদ্ধে পরিণত হতে পারে- এমন আশঙ্কা বাড়ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি মঙ্গলবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে, তবে ‘খারাপ কোনও চুক্তিতে তাড়াহুড়ো করবে না’।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে ইরানের নতুন প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক করেন।
যদিও ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি সংঘাতকে সাময়িকভাবে থামিয়েছে, তবুও উভয় পক্ষই সামরিক বিকল্প খোলা রেখেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি স্থবির সংঘাতে (ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট) রূপ নিতে পারে, যেখানে হরমুজ প্রণালীকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং মাঝেমধ্যে সহিংসতা দেখা দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনও স্থায়ী চুক্তি ছাড়া স্বল্পমাত্রার সংঘাত—যেখানে মাঝেমধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চলবে- উভয়পক্ষের জন্য একটি ‘সহজ পথ’ হতে পারে। তবে এতে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘায়িত হবে।
‘স্থবির’ যুদ্ধের খরচ
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ মেহরান কামরাভা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতোমধ্যেই এক ধরনের ‘স্থবির’ যুদ্ধ বলা যায়। তবে এ ধরনের ‘না-যুদ্ধ, না-শান্তি’ অবস্থা দীর্ঘদিন টেকসই নয়।
তার ভাষায়, “ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অবরোধ সহ্য করতে পারবে না, আবার যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন অবরোধ বজায় রাখতে পারবে না।” তিনি মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে এ অবস্থা চলতে পারে, কিন্তু মাস বা বছরের পর বছর নয়।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে হলে প্রতি মাসে অন্তত ৫৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে, যা বছরে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দর ও জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তৃতীয় একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ। এই অঞ্চলে ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপ ও জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। সেখানে জ্বালানির দাম প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দীর্ঘস্থায়ী নাকি পরিকল্পিত সংঘাত?
অসলোভিত্তিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইও-এর গবেষক চ্যান্ডলার উইলিয়ামস বলেন, প্রাথমিকভাবে এই যুদ্ধ ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই মাস পর তা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
তার মতে, “যখন কোনও রাষ্ট্র নির্ভুল বিমান হামলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তখন তা সমাধানের বদলে সংঘাত বাড়ায়।” তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই দীর্ঘায়িত সংঘাত কি পরিকল্পিত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজনে আবার হামলার হুমকি দিয়ে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালীকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বাধ্য করতে চাইছে।
অর্থনীতি ও মানবিক প্রভাব
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ফলে ইরানে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির অধিকাংশ শস্য আমদানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে হওয়ায় সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
‘মোয়িং দ্য গ্রাস’ কৌশল ও ঝুঁকি
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল ‘মোয়িং দ্য গ্রাস’—অর্থাৎ শিকড় রেখে ঘাসের আগা ছেটে ফেলার কৌশল—গ্রহণ করতে পারে। এর অর্থ হলো- মাঝেমধ্যে বড় আকারের হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল রাখা। এতে সংঘাত পুরোপুরি শেষ না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
তবে বিশেষজ্ঞ মাইকেল কের সতর্ক করে বলেন, ইরানের মতো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা থাকা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। “ইরানের বিরুদ্ধে এভাবে হামলা চালালে তারা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কুয়েতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে,” যোগ করেন তিনি।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিক শক্তি দিয়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
তাদের সতর্কবার্তা-যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই যুদ্ধ এক দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবির’ সংঘাতে পরিণত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা
