কুমার নদের করুণ দশা
অজয় দাস, ভাঙ্গা (ফরিদপুর)
এক সময় যে নদের ভরা যৌবন ছিল, সেই কুমার নদ এখন মৃতপ্রায়। এ নদের সঙ্গে এক সুতায় গাঁথা ভাঙ্গাবাসীর জীবন। এলাকার মানুষের ব্যবসাবাণিজ্য, যোগাযোগ, যাতায়াত, সেচ, কৃষি, গোসল, রান্নার পানির জোগানসহ নিত্যনৈমিত্তিক সব কাজই ছিল কুমার নদকেন্দ্রিক। এ নদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ফরিদপুর জেলার অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র ভাঙ্গা বাজার। এ নদ দিয়ে বড় নৌকা লঞ্চ, স্টিমারে করে পণ্য আনতেন ভাঙ্গার ব্যবসায়ীরা। কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্য ভাঙ্গা থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে বিক্রি করতেন। কিন্তু ভাঙ্গার সেই নদ এখন অস্তিত্ব হারানোর পথে। বেপরোয়া দখল আর দূষণে মৃত্যু ঘটছে নদের। এ নদের গড় প্রস্থ ৪৪ মিটার। দুটি ধারা মিলে কুমারের মোট দৈর্ঘ্য ১৯৪ কিলোমিটার। একটি ধারা গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাগদি ইউনিয়নের সেনদিয়া ঘাট এলাকায় মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ ও গোপালগঞ্জের মধুমতী নদীর সংযোগ খালে (বিলরুট ক্যানেল) গিয়ে মিশেছে। অপর ধারাটি ভাঙ্গায় গিয়ে কুমারের মূল স্রোতধারায় পড়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙ্গা পৌরশহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে কুমার নদ। একসময় যে কুমার নদের পানি নিত্যনৈমিত্তিক কাজে ব্যবহার করতেন পৌরবাসী, সেই ভাঙ্গা এখন পৌর এলাকার ময়লার ভাগার। দেখা গেছে, ভাঙ্গা বাজারের অধিকাংশ ময়লা-আবর্জনা নদীর পাড়ে ও নদের ভেতরে জমে আছে। ফলে নদের বিভিন্ন স্থানে জমেছে ময়লার পাহাড়। পৌর এলাকার ড্রেনের ময়লাও পরিশোধন ছাড়াই ফেলা হচ্ছে এ নদে। আরও দেখা গেছে, দূষণের পাশাপাশি দখলের কারণেও কুমার নদের প্রশস্ততা কমেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমার নদ দখলের পদ্ধতিও অভিনব। নদীর পাড়ের অনেক বাসিন্দা প্রতিনিয়ত ময়লা ফেলে ফেলে নদ ভরাট করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালা বদলের ফলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদ দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। ভাঙ্গা কোর্টপাড় এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী এ কে জহিরুদ্দিন আহমেদ (৬২) বলেন, আমাদের শৈশব ও কৈশোরের ভালো লাগার অন্যতম সঙ্গী ছিল এ কুমার নদ। এ নদী কত সাঁতার কেটেছি। সারা বছর প্রচুর পানি থাকত। বর্ষার সময় এ নদে তীব্র স্রোত থাকত। লঞ্চ, স্টিমার চলত। আমরা ভাঙ্গা থেকে লঞ্চে উঠে ঢাকা যেতাম। ভাঙ্গায় হাটে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় পাট ব্যবসায়ীরা এসে শত শত মন পাট কিনে স্টিমার বোঝাই করে ভাঙ্গা ছেড়ে যেত। এটা ’৭০-এর দশকের ঘটনা। দখল-দূষণে কুমার নদ তার অস্তিত্ব হারিয়েছে।
