বৃষ্টিপাত কমার ভয়ংকর প্রভাব রাজশাহীতে
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
গত পাঁচ দশকে রাজশাহীতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। পাশাপাশি নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বৃষ্টিপাত কমার ফলে দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ফলে কৃষি, জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তা ক্রমেই বড় হুমকির মুখে পড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ক্লিনার ওয়াটার’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতার কারণে ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট অব্যাহত থাকতে পারে। এক্সট্রিম ক্লাইমেট অ্যান্ড হাইড্রোক্লাইমেট মডেলিং অব ওয়াটার স্ট্রিচ : ভমপ্লেকিশন ফর লাইভহুডস ইন রাজশাহী, বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একদল গবেষক। গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র, আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, ভূগর্ভস্থ পানির উপাত্ত এবং রাজশাহীর ১৩ উপজেলার ৩৮৫ পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে গড় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষভাগে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কয়েক দফা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। ২০৮৮ সালের মধ্যে তা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও আছে। এ ছাড়া বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার দিনের সংখ্যা ২০১৮ সালের ১৩ দিন থেকে বেড়ে ২০৭৮ সালে প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে রাজশাহীর পানির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাঁরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং খরাসহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। গবেষকদের মতে পানিনির্ভর ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হলে রাজশাহীর ক্রমবর্ধমান পানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
