কৃষি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করবে খাদ্যনিরাপত্তা
শাহেদ আলী ইরশাদ
প্রতি বছরই কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়। কিন্তু কৃষকের লোকসানের গল্প যেন শেষ হয় না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মাঠের কৃষক এখনো আর্থিক সংকটে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সার ও জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে নতুন অর্থবছরে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও ভর্তুকি অব্যাহত রাখার ওপর।
গত এক দশকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের সাফল্যের কথা তুলে ধরলেও সেই খাদ্যের মূল উৎপাদক কৃষকের অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। রাজবাড়ীর কৃষক হুমায়ুনের অভিজ্ঞতায় সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। সেচ ব্যয় যোগ হলে খরচ দাঁড়ায় আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা বেশি। কিন্তু বাজারে ধানের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না।
কৃষকের অভিযোগ, সরকার ধান ও চালের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে বাজারের মুনাফা চলে যায় অন্যদের কাছে। ফলে কৃষকের আয় বাড়ে না, বরং উৎপাদনের ঝুঁকি ও ব্যয়ই বাড়তে থাকে।
উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। চলতি অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু ভর্তুকি বাড়ালেই হবে না, এর কার্যকর ব্যবহার এবং কৃষকের কাছে সরাসরি সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষক সেলিম জাহান বলেন, ‘সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে তা কৃষকের কাছে পৌঁছানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কৃষক পণ্য বিক্রি করার পর বাজারে যে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন হয়, তার কোনো অংশই কৃষকের কাছে ফিরে আসে না।’
এবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মধ্যপ্রাচ্যসংকট। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বহুলাংশে নির্ভরশীল আমদানীকৃত সার ও জ্বালানির ওপর। ইউরিয়া সার উৎপাদনের কাঁচামাল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সারের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রতি টন ৪৮০-৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৭০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ টন আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া টিএসপি, ডিএপি, এমওপিসহ অন্যান্য সারও মূলত আমদানিনির্ভর।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়ায় ২১, টিএসপিতে ২৩, ডিএপিতে ৫০ এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে থাকলে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষি বাজেটে এ বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেলিম জাহানের মতে কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি কমিয়ে দিলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এতে শুধু কৃষকের আয় কমবে না, সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কিত সরকারি তথ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চালের উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪৩ লাখ টন। অন্যদিকে খাদ্য ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। সে হিসেবে দেশে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু একই সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই উৎপাদন ও আমদানির এ বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও সরবরাহশৃঙ্খল সংকটের কারণে বিশ্বে চাল উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য সংগ্রহ করাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি শুধু কৃষককে সহায়তা করার বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যসংকট, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবাজারের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এবারের বাজেটে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ, ভর্তুকি এবং উৎপাদনসহায়তা কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।
