জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রাজধানীর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নিয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর হাতে হস্তান্তরের পর এ নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ডিআইএ একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবনায় মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের মূল শাখার প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে সরিয়ে সেখানে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শাখাগুলোতে শিক্ষা ক্যাডারের সহকারী অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতি প্রতিরোধ করে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য একটি ছয় সদস্য বিশিষ্ট তদারকি কমিটি গঠন করার কথাও বলা হয়েছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাবনায়। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে বিধিবহিভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে বর্তমানে ৩০ হাজার ৫৯৬ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। গত মে মাসে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর উঠে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, লুটপাট, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সীমাহীন অর্থবাণিজ্য চলেছে এখানে। প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্রছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রেও কোনো সীমা ছিল না। গত ১৫ বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নামে-বেনামে ৬০০ কোটি টাকার বেশি লোপাট করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৬৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৬২ জনই অবৈধ। এই শিক্ষকদের অনেকের নিয়োগে ডিজির প্রতিনিধির মনোনয়নপত্র নেই, কারও নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন সিট নেই, নিয়োগ কমিটির সুপারিশ অনুমোদন রেজল্যুশন নেই, যোগদান রেজল্যুশনও নেই। এই শিক্ষকদের কারোরই নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নেই, নিয়োগ আবেদন নেই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ছয়টি ক্যাম্পাসে প্রভাতি এবং দিবা শাখায় মোট ১৪টি শিফট চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৪টি শিফট অনুমোদিত। বাকি ১০টি শিফটের অনুমোদন নেই। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক উন্নয়ন ভাতা এবং নগর ভাতা প্রদানের সুযোগ না থাকলেও অনৈতিকভাবে এসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। এ দুই খাতে শিক্ষকরা লোপাট করেছেন ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৪ টাকা। এসব টাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে আদায় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট জমা দেওয়া হয়নি। ২০০৯-২০১০ অর্থবছর হতে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাট বাবদ সরকারকে ফাঁকি দেওয়া ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৬ টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করতে বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। স্কুলটিতে বিশেষ ক্লাসের নামে শিক্ষকদের সম্মানি দেওয়া হতো। এ সম্মানিতেও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ক্লাস ও পরিচালনা কমিটির সম্মানি বাবদ ১ কোটি ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৯৮৭ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালায় কমিটির সভার সম্মানির বিষয়ে কিছু বলা নেই। কিন্তু এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সম্মানির নামে ২ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মাণ বা মেরামত ও উন্নয়ন খাতে মোট ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮ হাজার ৪৪২ টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে ডিআইএ তদন্ত দল এসব অর্থ ব্যয়ের ভাউচার, ব্যয়ের প্রক্রিয়া, গভর্নিং বডির রেজল্যুশনসংক্রান্ত কোনো তথ্য পায়নি।

প্রতিবেদনে নির্মাণ বা উন্নয়ন খাতে করা বিপুল অর্থ ব্যয়ের ভাউচার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ না করায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা অথবা রেকর্ডপত্র উদ্ধারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। এরপরেও এ খাতে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭১২ কোটি খরচ দেখানো হয়েছে। এসব অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুদ্রণ খাতে আত্মসাৎকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে জমা করতে হবে। প্রশ্নপত্র ছাপা, বিজ্ঞাপন, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন খরচে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিবেদনে ভ্যাট বাবদ ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৬ টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করে চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গতকাল প্রতিবেদককে বলেন, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights