‘আটলাসের সিংহ’দের সামনে ব্রাজিল যেন ‘কাগুজে বাঘ’

অনলাইন ডেস্ক

ফিফা র‍্যাঙ্কিং বলছে— ব্রাজিল ও মরক্কো শক্তির দিক থেকে প্রায় সমানে সমান। তালিকায় ব্রাজিল যেখানে ৬ নম্বরে, মরক্কো ঠিক তার পেছনেই ৭-এ। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাব যে সবসময় মেলে না, সেটি আবারও মনে করিয়ে দিল এই ম্যাচ।

এই টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষ যেই হোক, ব্রাজিল মানেই অঘোষিত ফেবারিট। তাই সব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মাঠে নেমেছিল স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকা দল হিসেবে। কিন্তু ‘আটলাসের সিংহ’খ্যাত মরক্কো দেখিয়ে দিল—এটা শুধু হাইপ নয়, র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থানও একেবারেই যথার্থ।

ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলকে চাপে রাখে মরক্কো। নেইমারকে ছাড়া মাঠে নামা সেলেসাওদের তুলনায় আফ্রিকান দলটিকে বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। মরক্কোর মাঝমাঠের ক্ষুরধার খেলার সামনে ব্রাজিলের আসলে মাঝমাঠ বলতে তেমন কিছু ছিল না!

ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথমার্ধে দাপুটে খেলা উপহার দিয়েছে সর্বশেষ বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে খেলা দলটি। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল গুছিয়ে নিয়ে খেলায় ফিরলেও সেটা ছিল সেরা ছন্দের ব্রাজিল থেকেও অনেক দূরে। ফলে সব মিলিয়ে এই ম্যাচে ১–১ গোলের ড্রকে ন্যায্যই বলা যায়।

নিউ জার্সিতে প্রথমার্ধে ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের গোলটা বাদ দিলে নখদন্তহীন এক ব্রাজিলকে দেখা গেছে। বিশেষ করে শুরুর আধাঘণ্টা ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল ভীষণ হতাশাজনক। এই সময়টাতে ব্রাজিলের খেলা ছিল অস্থির ও ছন্দহীন।

প্রথমার্ধে ফরোয়ার্ড লাইনে ইগর থিয়াগো বেশ পরিশ্রম করছেন, তবে তা ফলপ্রসু ছিল না। দগলাস সান্তোসও ভালো খেলছেন। কিন্তু ইবানিয়েজ ছিলেন কূলকিনারাহীন, পুরোপুরি দিশাহারা। মরক্কোর আক্রমণগুলো যেন বুঝতেই পারছিলেন না। মার্কিংয়েও ভীষণ দুর্বল এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সামনে গিয়েও প্রভাব রাখতে পারেননি।

একইভাবে হতাশ করেছেন রাফিনিয়াও। গত মৌসুমে চোটের সমস্যায় ভুগেছেন, ফলে আগের দুর্দান্ত ফর্মও দেখা যায়নি তাঁর পায়ে। সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোয়ও ভালো খেলতে পারেননি। আজ রাফিনিয়া মাঠের সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড় নন শুধু এই কারণে যে ইবানিয়েজ ও পাকেতা আরও খারাপ খেলছেন। সব মিলিয়ে দু–একজন ছাড়া প্রথমার্ধে আর কেউ সন্তোষজনক পারফর্ম করতে পারেননি।

মিডফিল্ডকে কিছুটা সচল রেখেছেন ব্রুনো গিমারেস। ভিনির গোলে অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি মাঝ মাঠ থেকে দারুণ কিছু বল সামনে বাড়িয়েছেন। অন্যদিকে কাসেমিরো ও পাকেতা একের পর এক ভুল করেছেন।

ভিনির গোলটি ছিল সবকিছু ভুলিয়ে দেওয়ার মতো। ব্রাজিলের জার্সিতে এটি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দশম গোল। যখন ব্রাজিল চাপে পড়ে দিশাহারা, তখন গিমারাইসের বাড়ানো বল পেয়ে জাদু দেখিয়েছেন ভিনি।বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি শরীরের ভঙ্গিতে এমন ইঙ্গিত দেন যেন বাঁ দিকেই যাবেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাঁ পা থেকে ডান পায়ে বল সরিয়ে নেন, তারপর আরেকটি স্পর্শে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠেন। ফুলব্যাকের তখন কিছুই করার থাকে না।

এই কাজ ভিনি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে অনেকবার করেছেন। দেখতে যত সহজ লাগে, আসলে ততটা নয়। ফিনিশিংও ছিল অনেক দিন মনে রাখার মতো। আর এ কারণেই তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। বলা যায়, দলের সেরা খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই শেষ পর্যন্ত আনচেলত্তির হতাশাজনক ব্রাজিল দলকে প্রথমার্ধে রক্ষা করেছে।

বিরতির পর স্বাভাবিকভাবেই আনচেলত্তি একাধিক পরিবর্তন আনেন। প্রথমার্ধে বাজে খেলা ইবানিয়েজ ও কাসেমিরোকে তুলে মাঠে নামান ফাবিনিও ও দানিলোকে। এরপর ৬১ মিনিটে তুলে নেন ইগর থিয়াগো ও লুকাস পাকেতাকে, এ দুজনের বদলে নামেন মাতেউস কুনিয়া ও লুইস এনরিকে। আনচেলত্তি বদলি খেলোয়াড় নামানোর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রেখেছেন। যার প্রভাবও দেখা গেছে। ফাবিনিও মাঠে নেমে মাঝ মাঠে স্থিতিশীলতা আনায় কিছুটা সফলও হন। দানিলোও উইংয়ে খেলার ধার বাড়ান।

বিরতির পর ব্রাজিল অনেক বেশি শান্ত, গোছানো ও অবস্থান ধরে রেখে খেলায় ফেরার চেষ্টা করে। প্রতিপক্ষ যখন পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, তখনো তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্রভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গোলটা আর আসেনি। প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তিও কৌশলগতভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। যেমন ইগর থিয়াগোকে দলে আনার উদ্দেশ্য ছিল মরক্কোর অর্ধে চাপ সৃষ্টি করা এবং তাদের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের নিজেদের অবস্থান থেকে টেনে বের করে আনা। এর ফলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ভেতরের দিকে ঢুকে খেলার জন্য আরও জায়গা তৈরি হতো। কিন্তু পরিকল্পনাটা বাস্তবে সেভাবে কাজ করেনি। প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জন্য সতর্কবার্তাও।

ব্রাজিলের সামনে এখন তুলনামূলক সহজ দুটি ম্যাচ রয়েছে। নকআউট পর্বে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের মোকাবিলার আগে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার এটিই সুযোগ। আনচেলত্তি যে এখনো নিজের সেরা শুরুর একাদশ খুঁজে পাননি, সেটি স্পষ্ট। দলটি পুরোপুরি প্রস্তুতও নয়, দেখে মনে হয়েছে ‘কাগুজে বাঘ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights