সংসদে আলোচনায় তারেক রহমানকে নির্যাতন ইস্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর চালানো নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন ও বিচার দাবি করা হয়েছে। বাজেটকে গণমুখী ও ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তারা। তবে ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বলেছেন, মুদ্রাস্ফীতির হিসাব বিবেচনায় নিলে বাজেটের প্রকৃত আকার বাড়েনি; বরং এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট। গতকাল জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় প্রথমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার বলেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর চালানো নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন ও বিচার করতে হবে। এ ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। আবেগঘন বক্তৃতায় শাম্মী আক্তার বলেন, সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তারেক রহমান বলেছেন, এখনো এক্স-রে করলে দেখা যাবে তার মেরুদণ্ডের একটি হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে আছে। দীর্ঘদিন পরও তিনি সেই নির্যাতনের শারীরিক ক্ষত বহন করছেন। ‘তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, তিনি প্রতিশোধ নিতে চান না। তিনি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। এটি দেশের রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।’ তবে প্রতিশোধ না চাওয়ার অর্থ বিচারহীনতা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা চাই ১/১১-এর সময় তার ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরা হোক। কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। বাজেটকে গণমুখী আখ্যায়িত করে শাম্মী আক্তার বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কার্বন নিরপেক্ষ শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এবারের বাজেটে সময়োপযোগী কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোলার ইনভার্টার, সোলার মডিউল, লিথিয়াম ব্যাটারি, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে শুধু বর্তমানের জ্বালানি চাহিদা পূরণ নয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পথও সুগম হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে শাম্মী আক্তার বলেন, সাধারণ মানুষ বাজেটের পরিসংখ্যান দেখে না, তারা বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম দেখে।

তাই মূল্যস্ফীতি কমাতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি খাতে সার, বীজ, সেচ ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণে সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে। জিংক অ্যাশের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানোর উদ্যোগ উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। উৎপাদন খরচ কমলে সরবরাহ বাড়বে, আর সরবরাহ বাড়লে বাজারে চাপ কমবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এটিই বাস্তবসম্মত পথ।

বিরোধী দলগুলোর প্রতি বাজেট বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানান শাম্মী আক্তার। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ আছে কি না, সেই প্রশ্ন না তুলে আসুন আমরা সবাই মিলে জনগণের কল্যাণ, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এই বাজেট বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখি।

বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে দেশের বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। সে সময় প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। বর্তমানে স্বর্ণের দাম প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৪০০ গুণ বেড়েছে। অথচ বাজেট বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ গুণ। ফলে মুদ্রাস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান বাজেটকে সবচেয়ে বড় বাজেট বলা যায় না। এটিকে সবচেয়ে বড় বাজেট না বলে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট বলা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকার অভিযোগ তুলে নাজিবুর রহমান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বাজেট প্রণয়নে কোনো বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারেন না। বিভিন্ন দেশে অর্থবিল সংসদে উপস্থাপনের আগে স্থায়ী কমিটিতে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হলেও বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাজেট তৈরি হয় এবং সংসদ সদস্যরা কেবল তা অনুমোদন করেন।

দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণের সরকারি পরিকল্পনারও সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় ওই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, বাজেটঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নাজুক। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, দেশে মাত্র ২৪ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ কর দিলেও ভ্যাটের বোঝা বহন করতে হয় সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। চাল-ডাল কিনতে একজন দরিদ্র মানুষ এবং একজন ধনী ব্যক্তি একই হারে ভ্যাট পরিশোধ করেন। নতুন করে বিভিন্ন পণ্য ও সেবাকে ভ্যাটের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সুদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব।

জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিএনপি ও জামায়াতকেও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কারও খাঁচার মাছ নয়। গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে দেশছাড়া করেছে। বিএনপি-জামায়াতকেও ভাবতে হবে। আমরা যদি সুশাসন দিতে না পারি, চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে দেশ চালাতে চাই, তাহলে আমাদের পরিণতিও কী হবে, সেটি ভেবে দেখা দরকার। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাদের বিদেশে যাওয়ার জায়গা থাকতে পারে, কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সেই সুযোগ নেই। তাই জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির আহ্বান জানিয়ে ইজ্জত উল্লাহ বলেন, বাজেট নিয়ে সমালোচনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করলেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights