বগুড়ায় মাঝি পাড়ায় নৌকা তৈরির ধুম

বিশেষ প্রতিনিধি, বগুড়া

বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা এবং ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলসহ নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে নতুন নৌকা তৈরি এবং পুরোনো নৌকা মেরামতের ধুম পড়েছে। এতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মাঝিপাড়ার কারিগররা।

যাতায়াত ও জীবনযাত্রার একমাত্র ভরসা হওয়ায় এই সময়ে কারিগরদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। শুধু তাই নয় নৌকার মালিকরা নতুন কাঠ ও বাঁশ সংগ্রহ করতে বিভিন্ন হাটে যাচ্ছেন। কিনছেন নৌকা তৈরির সরঞ্জাম। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার ছোট ছোট নদীতে বর্ষার সময় নৌকাই একমাত্র চলাচলের ভরসা। যে কারণে এই মৌসুমে ব্যস্ততা বেড়ে যায় কারিগরদের।

জানা যায়, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলাতে বন্যা ও বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে নৌকা তৈরির ধুম পড়েছে। কেউ পুরাতন নৌকায় আলকাতরা ও জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে যোগাযোগের উপযোগী করে তুলছেন। অনেকেই শুধু নিজ পরিবারের লোকদের চলাচলের জন্য নৌকা তৈরি করছেন। তিনটি উপজেলার চরে রয়েছে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। এইসব চরে শুকনো মৌসুমে যোগাযোগের জন্য পায়ে হাঁটার পথ থাকলেও বর্ষা মৌসুমে তা একেবারেই থাকে না। জীবন ও জীবিকার জন্য নৌকা যেন নিত্যদিনকার অপরিহার্য জিনিস।

প্রতিটি গ্রাম প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি আলাদা আলাদা দ্বীপ। তাই বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগের জন্য নৌকাই একমাত্র ভরসা। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে একাধিক করে নৌকা। ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া আসা ও জীবন জীবিকার জন্য, অসুখে বিসুখে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে পৌঁছানো সব কাজেই প্রয়োজন হয় নৌকার। তাই এ মৌসুমে নৌকা কেনা-বেচা ও পুরাতন নৌকা মেরামতের ধুম পরে যায় উপজেলাগুলোয়।

স্থানীয়রা জানান, যমুনা ও বাঙ্গালী নদী বেষ্টিত সারিয়াকান্দি উপজেলা বর্ষাকালে বিশাল এলাকাজুড়ে বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানিতে অনেকেই জীবন-জীবিকার তাগিদে মাছ শিকার করে থাকেন। পণ্য পরিবহনে নৌকা প্রধান বাহন হয়। এক চর থেকে অন্য চরে চলাচল করা ছাড়াও খেয়া পারাপারের ক্ষেত্রে প্রধান বাহন হিসাবে কাজ করে নৌকা।

আকারভেদে এই নৌকা তৈরিতে খরচ পড়ে ১৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। এরই মধ্যে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এজন্য নৌকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে ব্যাপক হারে। সেজন্য নদী পারের মানুষেরা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ১০ হাত লম্বা থেকে ৭০ হাত পর্যন্ত লম্বা নৌকা তৈরি করছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।

সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের চান্দিনা নোয়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হারুনুর রশিদ জানান, এবার তিনি ৩০ হাত একটি নৌকা তৈরি করিয়ে নিচ্ছেন। তিনি ছাড়াও উপজেলার অনেকেই নতুন নৌকা তৈরি করছেন বর্ষায় ব্যবহার করার জন্য।
নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত কালিতলা ঘাটের আলম মিস্ত্রি বলেন, আমি ১০ হাত নৌকা তৈরি করে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রয় করি। গত বর্ষা মৌসুমে ৭০ থেকে ৭৫টি নৌকা তৈরি করেছিলাম। এবারও সেরকম নৌকা তৈরি ও মেরামত করার অর্ডার পেয়েছি। পর্যায়ক্রমে এগুলো তৈরি করব। এজন্য আমাকে দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। ছোট নৌকা বেশির ভাগই যমুনা নদীতে মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করার জন্য নেয়। তিনি আরও বলেন, আমার মত আরও অনেকে বড় বড় নৌকা তৈরি করছেন। যেগুলো ৫০ হাজার থেকে ৭লাখ টাকা পর্যন্ত।

বগুড়া কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, কৃষি পণ্য আনা নেওয়া করার জন্য বর্ষাকালে নৌকা ব্যবহার করা হয়। নৌকা ছাড়া নদী পাড়ের মানুষের চলাচল অসম্ভব। তাই এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে এখন পুরাতন নৌকা মেরামত ও নতুন নৌকা তৈরির ধুম পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights