বেসরকারি খাতের ঋণে গতি নেই

অনলাইন ডেস্ক

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রত্যাশিত আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ফলে বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না, যা অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৯৮ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে মোট ১৭ লাখ ৩৮ হাজার ৭৬৯.৮০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল, যা এক বছর পরে বেড়ে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯.৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ঋণের মোট পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন সময়কালে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ। কিন্তু বছরের প্রথম পাঁচ মাসের কোনো মাসেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এতে স্পষ্ট যে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় ঋণ প্রবাহ না থাকায় বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার, যা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপ নতুন ঋণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি করছে।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়ছে। নতুন শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তাঁরা ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সম্মাননীয় ফেলো হেলাল আহমেদ জনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনা, ব্যবসাবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণ কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে পারলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়তে পারে। অন্যথায় এই নিম্নগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর আরো চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৩০ জুন ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬.৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) বিঘ্ন, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবের কারণে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুরো সময়ে মন্থর ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরেছে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আগামী দিনগুলোতে বাড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত (রিয়েল) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। ফলে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এখনো তুলনামূলক দুর্বল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights