চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই

মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম

ঘরবাড়িতে পানি। কোথাও কোমর, কোথাও বুক সমান কিংবা আরও বেশি। রান্নার ব্যবস্থা নেই, নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ। ভেঙে পড়ছে কাঁচা ঘরবাড়ি। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চলছে চট্টগ্রামের পানিবন্দি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।

দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা অতীতে বুক চিতিয়ে সামলেছেন ঘূর্ণিঝড়সহ নানা বড় আকারের বিপর্যয়। সেই সাহসী মানুষগুলোই এবার বন্যার পানিতে দিশেহারা। তারা বলছেন, নিকট অতীতে বন্যার এমন রুদ্রমূর্তি আর দেখা যায়নি।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর একটি সাতকানিয়া। এ উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তাহের জানান, হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। দিন কাটাচ্ছেন খেয়ে না খেয়ে। ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। নৌকা ছাড়া যাতায়াত করা যাচ্ছে না। ১০-১২ জন ধারণক্ষমতার একেকটি ইঞ্জিন নৌকা একদিনের জন্য ৪০-৫০ হাজার টাকা ভাড়া হাঁকছে। টাকা দিয়েও নৌকা মিলছে না। তাই হাসপাতাল এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার মতো জরুরি প্রয়োজনেও মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করতে পারছেন না। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা নারীরা আছেন বেশি ঝুঁকিতে।

তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পানির নিচে থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। গত শুক্রবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢেমশা এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়।

সাতকানিয়ার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে অবস্থিত কেরানীহাট থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকার সড়কের একাধিক স্থানে পানি উঠে গেছে। যে কারণে সদরের সঙ্গে অন্যান্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ঢেমশা বোর্ড অফিস হয়ে নৌকযোগে স্রোতের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় আধাঘণ্টা পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে পৌঁছাতে হচ্ছে। তবে এ কাজটিও অনেক কষ্টকর। প্রয়োজনের সময় নৌকাও মিলছে না।

সাতকানিয়া উপজেলার ৯০ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, নৌকা ছাড়া যাতায়াত কঠিন। উপজেলা প্রশাসন কিছু নৌকা সংগ্রহ করে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

চট্টগ্রামের সাগর উপকূলবর্তী বাঁশখালী উপজেলার প্রায় পুরোটাই বন্যা কবলিত। অধিকাংশ এলাকার রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য বিভিন্ন এলাকায় চলছে হাহাকার। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডের আসকরিয়াপাড়া এলাকার বয়োবৃদ্ধ সৈয়দ নামের এক ব্যক্তি পানিতে নিমজ্জিত সড়কে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সহায়তার আকুতি জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি জন্মের পর ৬৭ বছরের জীবনে কখনো এত পানি দেখিনি।

বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের চাঁপাছড়ি এলাকার বাসিন্দা জুয়েল মল্লিক জানান, তাদের এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে কোমর থেকে গলাসমান পানি। অনেক কাঁচাঘর ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে মাটির ঘর ধসে পড়ছে। সরকারি ত্রাণ এখনও ওই এলাকায় পৌঁছায়নি। বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। অনেক বাড়িতে রান্না করার মতো অবস্থা নেই। এ অবস্থায় না খেয়ে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

একই উপজেলার ছনুয়া এলাকার বাসিন্দা মো. সুহিন জানান, ওই এলাকার মাটির ঘরগুলো ধসে পড়ছে। অনেক বাড়িতেই এখনও কোমরসমান পানি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া গতকাল বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। তিনি জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি আগের দিনের চেয়ে কিছুটা কমেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার দক্ষিণাংশের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ এবং উত্তরাংশের হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতেও কম-বেশি বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights