সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ তারুণ্য

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক

‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’তে ব্যান্ডসংগীতের তালে মেতেছিল হাজারো শ্রোতা-দর্শক। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল উন্মুক্ত সংগীতাঙ্গনে। প্রিয় ব্যান্ডের গান সরাসরি শোনার আশায় দুপুর থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন সংগীতানুরাগীরা। সময় যত গড়িয়েছে, শ্রোতা-দর্শকের উপস্থিতিতে ততই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো আয়োজন। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা আর ব্যান্ডসংগীতের তালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’ পরিণত হয় এক সংগীতমুখর উৎসবে। গতকাল অনুষ্ঠিত হয় এই আসর। এতে সংগীত পরিবেশন করে নগর বাউল জেমস, মাইলস, ওয়ারফেজ, ফিডব্যাক, আর্টসেল, শিরোনামহীন ও মেকানিক্সসহ দেশের জনপ্রিয় সাতটি ব্যান্ড। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ কনসার্টের পর্দা ওঠে বিকাল ৪টায় । আর সাত ব্যান্ড নিয়ে সাত ঘণ্টার এই আয়োজন চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। শুরুতেই মঞ্চ মাতায় হেভি মেটাল ব্যান্ড মেকানিক্স। দেশকে উৎসর্গ করে ‘অপরাজেয়’ গানের মাধ্যমে পরিবেশনা শুরু করে দলটি। এরপর প্রয়াত ও সাবেক সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গায় ‘নিয়তি’। একে একে ‘ছিন্ন পৃষ্ঠা’ ‘শুভ্র শহর’ এবং প্রথম অ্যালবামের জনপ্রিয় গান ‘বিস্ময়’ পরিবেশন করে তারা। প্রায় ৪০ মিনিটের পরিবেশনায় পাঁচটি গান উপহার দেয় ব্যান্ডটি। মেকানিক্সের দলনেতা ও ভোকালিস্ট আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব বলেন, ‘সমাজের নানা অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গানের মাধ্যমেই আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে যেতে চাই।’ এরপর মঞ্চে আসে জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন। ‘পাখি’ গান দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে সংগীতযাত্রা শুরু করে দলটি। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে পরিবেশন করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’। এরপর ‘মা’ ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’ ‘এই অবেলায়’ ও ‘আবার হাসি’সহ জনপ্রিয় গানগুলোতে মেতে ওঠেন উপস্থিত দর্শকরা।

শিরোনামহীনের দলনেতা, বেজ গিটারিস্ট ও গীতিকার জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত কনসার্ট। তবে আমাদের ব্যান্ডসংগীতশিল্পীদের সংগঠন বামবাও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।’ শিরোনামহীনের পর একে একে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করে আর্টসেল ও ফিডব্যাক। সবশেষে মঞ্চ মাতায় নগর বাউল জেমস ও এর আগে ছিল মাইলসের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে এবারের আয়োজনের পরিবেশনায়ও রাখা হয় বিশেষ মাত্রা। সাতটি ব্যান্ডের অংশগ্রহণে সাত ঘণ্টার এই সংগীত আয়োজন নিয়ে ওয়ারফেজের ভোকালিস্ট শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘আজ ৭ নভেম্বর, সাতটি ব্যান্ড এবং সাত ঘণ্টার অনুষ্ঠান, তাই আমরাও মঞ্চে সাতটি গান পরিবেশনের চেষ্টা করব।’ কনসার্ট আয়োজনের উদ্দেশ্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিস্তৃতি প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্যই আমাদের এই আয়োজন। আমরা চাই দর্শক যেন কোণায় কোণায় ভরে যায়। প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি, যাতে মানুষ আনন্দ করতে পারে এবং বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করতে পারে।’ এদিকে কনসার্টের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (বামবা)। সংগঠনটির সহসভাপতি ও ওয়ারফেজের সদস্য শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘বামবা যখন কোনো কনসার্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন সেটিকে আমরা নিজেদের ঘরের আয়োজন হিসেবেই দেখি। এ ধরনের আয়োজনে আনন্দ, পরিবেশ ও শৃঙ্খলার বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পায়। ব্যান্ড নির্বাচন, সাউন্ড, লাইট, মঞ্চের ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নিরাপত্তা-সব ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার চেষ্টা করি। যাতে দর্শক-শ্রোতারা উৎসবের আমেজে নির্বিঘ্নে গান উপভোগ করতে পারেন।’ সব মিলিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের এই আয়োজন কেবল ব্যান্ডসংগীতের পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাদের এক মঞ্চে মিলিত হওয়ার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights