নেসকোর সদর দপ্তর বগুড়ায় স্থানান্তরের দাবি

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার ২৯টি উপজেলায় ৬০টি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম করে আসছে নেসকো।

বর্তমানে রাজশাহী জেলা সদরে নেসকোর প্রধান কার্যালয় তৎকালীন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী দপ্তর, হেতেম খাঁ, রাজশাহীতে পুরাতন ভবনে অবস্থিত। ওই ভবনে নেসকোর বিভিন্ন ওভারহেড অফিসের কার্যক্রম চালু আছে। রাজশাহীতে নেসকোর কোনো কর্পোরেট ভবন নির্মাণ করা হয়নি। যেহেতু নেসকোর অপারেশন এলাকা উত্তরের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এবং পূর্ব-দক্ষিণের পাবনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত, সেহেতু নেসকোর সদর দপ্তরের ভৌগোলিক এরিয়ার দক্ষিণের জেলা সদর রাজশাহীতে হওয়ায় রংপুর বিভাগের আওতাধীন ৮টি জেলার অপারেশনাল কার্যক্রম যথাযথভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, ১৬ জেলার মানুষের সুবিধার্থে নেসকোর সদর দপ্তর রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলমান। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রধান কার্যালয়টি রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের জন্য একটি প্রস্তাব পাঠালে মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রধান কার্যালয়টি বগুড়ায় স্থানান্তরের জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও মানববন্ধরে ডাক দিয়েছে জেলার সর্বস্তরের জনগণ।

জানা যায়, রংপুর জোনের সিস্টেম লস রাজশাহী জোনের তুলনায় গড়ে ২ শতাংশ থেকে ২.৫০ শতাংশ বেশি এবং বকেয়া প্রায় দুই সমমাস বেশি। প্রধান প্রকৌশলী বিতরণ জোন, রংপুর দপ্তরের আওতাধীন নির্বাহী প্রকৌশলী/আবাসিক প্রকৌশলীর দপ্তরসমূহ বিশেষ করে তেতুলিয়া, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সেতাবগঞ্জ, হাতিবান্ধা, পাটগ্রাম, ডোমার, জলঢাকা, বড়খাতা, কিশোরগঞ্জ, বুড়িমারি দপ্তর রাজশাহীর প্রধান কার্যালয় থেকে সড়কপথে গড় দূরত্ব ২৩৫ কিলোমিটার হওয়ায় ভৌগলিক দূরত্বের কারণে রাজশাহী প্রধান কার্যালয় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রংপুর জোনের বিভিন্ন দপ্তরসমূহে নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা সম্ভব হয় না।

প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে রংপুর জোনের বিভিন্ন দপ্তর এবং রংপুর জোনের বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে প্রতিনিয়ত রাজশাহীতে যাতায়াতে যানবাহনের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।

২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নেসকোর ৫১তম বোর্ড সভায় ২টি বিভাগের মধ্যবর্তী স্থানে প্রধান কার্যালয় স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে অনুযায়ী বগুড়া জেলার সদর উপজেলার আওতাধীন নেসকোর পুরান বগুড়া বিদ্যুৎ ভবন ও তৎসংলগ্ন ক্যাম্পাসটি বিবেচনা করা হয়।

এই ক্যাম্পাসের মোট আয়তন ৫১.৫৯ একর। যার ৭.৫ একর পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাব-স্টেশনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ক্যাম্পাসে বর্তমানে নতুন ১টি তিনতলা বিশিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় রয়েছে। এছাড়া অপর একটি তিনতলা বিশিষ্ট পুরাতন ভবন রয়েছে। যেখানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বগুড়ার কার্যালয় স্থানান্তরপূর্বক নতুন তিনতলা ভবনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালকদের দপ্তর মুহূর্তে স্থানান্তর করা সম্ভব।

এছাড়াও ২টি দ্বিতল বিশ্রামাগার ভবন এবং ২টি আবাসিক ভবন রয়েছে। যেহেতু পুরান বগুড়া বিদ্যুৎ ভবন সংলগ্ন ক্যাম্পাসটিতে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। সেহেতু নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তর করলে এই মুহূর্তে কোনো বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না। এছাড়াও বর্ণিত ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় ভবিষ্যতে প্রয়োজনে যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হবে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যবর্তী স্থান বগুড়া জেলায় নেসকোর সদর দপ্তর প্রতিস্থাপন করা হলে সার্বিক অপারেশনাল কাজে গতি বাড়াসহ গ্রাহক সেবার মান উন্নয়ন হবে।

এদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী জেলা শহর থেকে বগুড়া জেলা শহরে স্থানান্তর প্রসঙ্গে একটি পত্র প্রদান করা হয়। সেই পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা, বিদ্যুৎ বিভাগ ৩ মার্চ এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নিমিত্তে একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা সরেজমিন পুরান বগুড়া ক্যাম্পাসটি পরিদর্শন করেছেন। নেসকোর সদর দপ্তরটি রাজশাহী থেকে বগুড়ায় আনার জন্য তারা একমত পোষণ করেছেন।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি এম এস এম আতিকুর রহমান বাদল জানান, সিস্টেম লস হ্রাস ও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি খরচ সাশ্রয়, ভ্রমণ ব্যয় হ্রাস ও সর্বোপরি গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করার স্বার্থে নেসকোর হেড অফিস রাজশাহী থেকে বগুড়া জেলা শহরে স্থানান্তর করার প্রয়োজন।

বগুড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু বলেন, বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের রাজধানী বলা হয়ে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি। এজন্য নেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এই জেলায় হওয়া জরুরি। বগুড়ার সাথে উত্তরাঞ্চলের মানুষের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার সেতুবন্ধন রয়েছে। তাই বগুড়ার কৃতি সন্তান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমিতে নেসকোর সদর দপ্তর প্রতিস্থাপন করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নেসকো বগুড়ায় স্থানান্তরের জন্য বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠালে মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগকে বগুড়াবাসীর পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights