গণতন্ত্র যখন জনতার কথা শোনে: ভারত-বিভুঁইয়ের অভিজ্ঞতা

বিশেষ প্রতিনিধি
গণতন্ত্রকে প্রায়ই ভোটদানের দিবস দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু এর প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় ভোটের পর-যখন নাগরিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, জবাবদিহিতা দাবি করে এবং প্রয়োজনে ভুল সংশোধনের আহ্বান জানায়।

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর কাছে পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অগ্রগতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই তারা যখন ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা দাবি করে, তখন তারা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত সাম্প্রতিক ঘটনায় একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেছে। নির্বাচিত সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরও জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পথে এগোনোর ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন-সমালোচনা শোনা, তা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের পথে হাঁটা। এটি দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার শাসনের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু সেই ম্যান্ডেট পাঁচ বছরের জন্য জনগণকে উপেক্ষা করার সুযোগ নয়। নির্বাচন সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, আর সাংবিধানিক গণতন্ত্র সেই ক্ষমতার ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে। সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। তাই সরকারকে শুধু নির্বাচনের দিন নয়, প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, তরুণরা আর রাজনীতির নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। তারা ন্যায্যতা, জবাবদিহিতা এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে সচেতন। তাদের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনকে ঘিরে নয়; তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান সুযোগ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মানও চায়।

গণতন্ত্র শুধু নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো-ক্ষমতার পালা বদলের পরও নাগরিকরা যেন তাদের নেতাদের প্রশ্ন করতে পারে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। সরকার জনগণের দাবি ও সমালোচনার প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, ইতিহাস সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

যুক্তরাজ্যে সরকারকে সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের ধারাবাহিক নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় জবাবদিহিতা জোরদারে নাগরিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে নাগরিক, আদালত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়। তবে চীন এ ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উদাহরণ সামনে আনে। অধিকতর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক সংস্কার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৮৯ সালে তিয়েন আনমেন স্কয়ারে হওয়া ছাত্র আন্দোলন মর্মান্তিক সামরিক দমন-পীড়নের মুখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আধুনিক ইতিহাসে একটি শক্তিশালী নিদর্শন-যেখানে দেখা যায়, সরকার যখন সংলাপের বদলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের দাবির জবাব দেয়, তখন কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য অনেক সময়ই নির্ভর করে নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কতটা অর্থবহ সুযোগ রয়েছে তার ওপর।

এই উদাহরণগুলো এ কথা বলে না যে গণতন্ত্র নিখুঁত। প্রতিটি সমাজেই বিক্ষোভ, মতবিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ থাকে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সরকার কীভাবে সেসব সমস্যার মোকাবিলা করে। তারা কি শোনে, ভেবে দেখে এবং সংস্কার আনে, নাকি সমালোচনাকে হুমকি হিসেবে উড়িয়ে দেয়? একটি পরিণত গণতন্ত্র তার নাগরিকদের প্রশ্নকে ভয় পায় না। বরং সেই প্রশ্নকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।

এই নীতিটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সংবিধান কেবল নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা দেয় না, একই সঙ্গে নাগরিকদের সেই ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে সুরক্ষাও দেয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হতে পারে না, আর নির্বাচনী বিজয় নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় বিজয়ের পর। শক্তিশালী নেতা তারা নন, যাঁরা কখনও সমালোচনার মুখে পড়েন না। বরং তারাই শক্তিশালী, যাঁরা উদ্বেগগুলো স্বীকার করার বিনয় রাখেন এবং ভুল সংশোধনের আত্মবিশ্বাস দেখান।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: নির্বাচন নির্ধারণ করে কে শাসন করবে, কিন্তু এতে জনগণের কণ্ঠ রোধ হয় না। গণতন্ত্র নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়েও টিকে থাকে জন-সংলাপ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।

শাসকরা কতটা ক্ষমতাবান দেখায় তা দিয়ে একটি জাতির শক্তি পরিমাপ করা হয় না; বরং তা নির্ভর করে সাধারণ নাগরিকরা কথা বলার সাহস রাখে কি না, এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা শুনতে, আত্মসমালোচনা করতে এবং প্রয়োজন হলে পথ সংশোধন করতে কতটা বিনয় ও প্রজ্ঞা দেখায় তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights