একের উত্থান অপরের পতন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পুঁজিবাদ যে মৌলবাদকে পুষ্ট করে সে ব্যাপারটা অস্পষ্ট নয়, যদিও তাকে অস্পষ্ট রাখার চেষ্টা চলে। পুঁজিবাদ দারিদ্র্য-বৈষম্য এবং অজ্ঞতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করে থাকে। দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা মৌলবাদের প্রধান আশ্রয়। পুঁজিবাদী বৈষম্য দারিদ্র্য উৎপাদনের কারণ এবং ওই বৈষম্য গরিব মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সামাজিক বৈষম্যের প্রতিপালক; ওই রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিকাংশ মানুষকে বঞ্চিত ও বিচ্ছিন্ন করে রাখে। বিশেষ করে প্রান্তিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে দেখা যায় শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিপীড়নের অতি নিষ্ঠুর যন্ত্র। পীড়িত মানুষ বিচার পায় না, আশ্রয় পায় না, প্রতিশ্রুতিও পায় না। সেই সঙ্গে তারা দেখে অল্প কিছু মানুষ যারা বলে তারা ইহজাগতিক, আচ্ছাদন নেই উদারনীতির, সেই মানুষগুলো পরম বিলাস ও অপচয়ের জীবনযাপন করছে; দেখে ক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের ক্রোধ ও ক্ষোভ প্রকাশের কোনো গণতান্ত্রিক পথ যেহেতু খোলা পায় না তাই চলে যায় ধর্মের দিকে। ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদীরা এই ব্যবস্থার চমৎকার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে; তারা সমর্থক পায়, অনুসারী পেয়ে যায়, তাদের হিংস্রতা আরও উগ্র হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে মৌলবাদ আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। একদিক দিয়ে এটা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত। কেননা বাংলাদেশের অভ্যুদয় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান ও পরাভূত করে। কিন্তু পরাভূত শক্তি আবার ফিরে এসেছে, অধিক শক্তিমত্তায়। তার পরাজয়টা কেবল যে সশস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেছিল তা নয়, ঘটেছিল আদর্শিকভাবেও।। তাহলে কেন তার পুনরুত্থান? কেমন করে?

বোঝা যায় যে, মৌলবাদীরা তাদের আদর্শিক পরাজয়টি মেনে নেয়নি। দৈহিকভাবে হেরে গিয়ে এবং ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে ছিল মাত্র। পরে পরিস্থিতি আগের মতো প্রতিকূল নেই দেখে ফিরে এসেছে। এই যে পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়া এর প্রধান উপাদান কী? সেটা হলো পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ওই যে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে সমষ্টির তুলনায়- এই নীতিটি আগের রাষ্ট্রগুলোতে কার্যকর ছিল। মনে হয়েছিল বাংলাদেশে তা থাকবে না, কেননা বাংলাদেশ হবে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক, সেখানে রাষ্ট্র হবে সবার সাধারণ সম্পত্তি, যার দরুন রাষ্ট্র তার শোষণকারী ভূমিকা ছেড়ে রক্ষাকারীর ভূমিকা নেবে এবং সমাজে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সেটাই ছিল স্বপ্ন। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। যার ফলে অধিকাংশ মানুষের জীবনে দুঃস্বপ্ন নেমে এসেছে, এমন দুঃস্বপ্ন যা ছিল কল্পনার বাইরে, কারণ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় তাদের আশা দিয়েছিল, ভাববার সাহস জুগিয়েছিল যে স্বপ্ন দূরে নয়, নিকটবর্তী বটে।

চোখ কচলে মানুষ দেখেছে যে যুদ্ধ করল সবাই, কিন্তু সুফল চলে গেছে ধনীদের গৃহে। উনিশশ সাতচল্লিশের স্বাধীনতাতে যারা উপকৃত হয়েছিল, একাত্তরের স্বাধীনতাতে তারাই উপকার পেয়েছে, দ্বিতীয়বার। আতঙ্কের বিষয় চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে ব্যাপকতা লাভ করেছে একাত্তরের পরাজিত মৌলবাদী চক্র। কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে রাজাকার সেটা কোনো বিবেচনার বিষয় রইল না, সত্য হয়ে উঠল পরাজিতদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। অন্য কিছু নয়। দেশে নির্বাচন হবে-হচ্ছে কিন্তু পরিস্থিতি এখনো শতভাগ আশা ও আস্থা জাগাতে পারছে না। নির্বাচন নিয়ে দোদুল্যমান পরিস্থিতি আঁচ করা যাচ্ছে। অথচ দেশে একটি নির্বাচন হওয়া অতি জরুরি। অসাংবিধানিক সরকারের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা দেশের জন্য শুভকর নয়। শুভকর নয় সরকারের জন্যও। তাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প এ মুহূর্তে আর কিছু নয়।

”তাহলে পথ কী? পথ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে চেতনার মূল বিষয় ব্যক্তির নয়, সমষ্টির স্বার্থকে বিকশিত করা। সম্পদ উৎপাদন তো বটেই, সম্পদের সুষম বণ্টনও প্রয়োজন হবে। শত্রু চলে গেছে মনে করেছি, কিন্তু শত্রু মোটেই যায়নি…”

রাষ্ট্র আবার সেই পুরোনো পুঁজিবাদী পথ ধরে এগোনোর অপেক্ষায়। গণতন্ত্রের পরিবর্তে কখনো বৈধ কখনো অবৈধ স্বৈরশাসন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে গণতন্ত্রকে আরও বিপদগ্রস্ত করল। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অজ্ঞতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেল। অধিকাংশের স্বার্থ না দেখে কতিপয়ের স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়াল পীড়নকারী প্রতিষ্ঠান, যার কাছে আশ্রয় নেই, ভরসা নেই ন্যায়বিচারের।

কথা ছিল শিক্ষা হবে অভিন্ন ও সর্বজনীন। তা হয়নি। পাকিস্তানি রাষ্ট্রে এবং তারও আগে যে তিন ধরনের শিক্ষা ধারা প্রচলিত ছিল, তারা প্রবল বেগে ফিরে এসেছে।

এটাও দেখা গেছে যে, ধনীরা মনে করেছে, তারা ধনী হয়েছে ভাগ্যগুণে। তারা আরও ধনী হতে চায়। আবার ভিতরে ভিতরে অপরাধবোধও কাজ করেছে। কেননা জানে তাদের ধনার্জনের পথটা যে সৎ ছিল তা নয়, ছিল অপরাধাচ্ছন্ন। সৌভাগ্যের অত্যাশ্চর্য তৎপরতার জন্য কৃতজ্ঞতা এবং অপরাধবোধের বোঝা এই দুয়ের তাড়নায় ধনীরা ধর্মকার্য ধরেছে। তারা মোটেই ধার্মিক নয়, ধর্মের আনুষ্ঠানিকতাটাই করে, আধ্যাত্মিকতার বালাই নেই। কিন্তু তাদের দৃষ্টান্ত কম বিত্তবানদের অস্থির করে ধর্মের পথ ধরতে।

সমাজের প্রায় সবাই এখন পুঁজিবাদী। ব্যক্তিগত মুনাফা চায়। অন্যের ভালোমন্দ সম্পর্কে আগ্রহ কমছে, ক্রমাগত সংকীর্ণ, স্বার্থবুদ্ধিসর্বস্ব ও হতাশ হয়ে পড়ছে। হতাশা একটি ভয়ংকর ব্যাধি। ধর্মসহ নানাবিধ মাদকাসক্তি ওই ভূমিতে লালিত-পালিত হয়।

প্রতিশ্রুতি ছিল যে, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। রাষ্ট্র তা করেনি। বস্তুত রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে কেবল যে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে তা নয়, সেখানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে যুক্ত করেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের তৎপরতা তো রয়েছেই, মৌলবাদীদের পাশাপাশি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলও প্রায় প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতেই ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে এসেছে।

এসব মিলিয়েই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও দার্শনিক ইহজাগতিকতাকে উৎসাহিত করছে না, বরঞ্চ মানুষকে প্ররোচিত করছে উল্টো দিকে যেতে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারকরা দুই ভাগে বিভক্ত। উদারনীতিক ও বামপন্থি। উদারনীতিতে বিশ্বাসী যাঁরা, তাঁরা জনগণের ওপর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। কেননা তাঁরা ভদ্রলোক এবং জনবিচ্ছিন্ন। তদুপরি তাঁরা হচ্ছেন বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমর্থক, যে ব্যবস্থাকে শ্রমজীবী মানুষ মনেপ্রাণে ঘৃণা করে, যদিও প্রকাশ করার পথ পায় না। উদারনীতিকরা ব্যক্তির বিকাশকে সমর্থন করেন, সমষ্টির বিপরীতে। তাঁরা রাষ্ট্রের অনুগ্রহপুষ্ট, নানাভাবে। তাঁদের দৃষ্টান্ত বা আদর্শ কোনোটাই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইহজাগতিকতার প্রকৃত সমর্থক হচ্ছেন বামপন্থিরা। কিন্তু কিছুটা নিজেদের দার্শনিক দুর্বলতা, কিছুটা পরদেশনির্ভরতা এবং অনেকটা রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার বৈরিতার কারণে তাঁরা প্রবল হতে পারেনি। স্মরণীয় যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় নীতি ছিল রাজাকারদের ক্ষমা করা এবং বামপন্থিদের প্রয়োজনে হত্যা করা। জনগণ বিক্ষুব্ধ, তাদের সেই বিক্ষোভ বাম দিকে যাবে-এমন পথ এখনো তৈরি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ ডান দিকেই যাচ্ছে এবং ডানপন্থিদেরও ডানে যাদের অবস্থান, সেই মৌলবাদীরা সুবিধা করে নিচ্ছে।

তাহলে পথ কী? পথ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে চেতনার মূল বিষয় ব্যক্তির নয়, সমষ্টির স্বার্থকে বিকশিত করা। সম্পদ উৎপাদন তো বটেই, সম্পদের সুষম বণ্টনও প্রয়োজন হবে। শত্রু চলে গেছে মনে করেছি, কিন্তু শত্রু মোটেই যায়নি। শত্রু হচ্ছে ব্যক্তির স্বার্থকে বড় করে তোলা এবং সেই গুরুত্বদানের পেছনে কাজ করছে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও আদর্শ-শত্রু তারাও। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আসলেই শেষ হয়নি। সেই যুদ্ধে হেরে গেলে কেবলই পেছন দিকে হটতে থাকব, এখন যেমন হটছি ক্রমাগত।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights