এগোচ্ছে না মহাকাশ গবেষণা

জিন্নাতুন নূর

প্রতিষ্ঠার চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মহাকাশ গবেষণা বা অর্থনীতিতে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত মহাকাশ গবেষণা খাতে বহুদূর এগিয়ে গেলেও মহাকাশ প্রযুক্তির অবকাঠামোগত অভাব, বৈজ্ঞানিক সংকট ও গবেষণা কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় এ খাতে বলার মতো কিছু করতে পারেনি। মহাকাশ গবেষণায় এখনো ধীরগতিতে হাঁটছে বাংলাদেশ। তবে দেরিতে হলেও প্রথমবারের মতো রকেট ও স্যাটেলাইট উৎপাদন, রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে স্পারসো কর্তৃপক্ষ। রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণে গৃহীত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প আগামী দুই মাসের মধ্যে স্পারসোতে জমা দেওয়ার কথা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের। এরপর সরকারের অনুমোদনে চূড়ান্ত হবে রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশন ও স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনার জন্য চূড়ান্ত স্থান।

স্পারসোর দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানায়, এ সমীক্ষা পরিচালনার জন্য দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান-ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। এ সমীক্ষায় তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এগুলো হচ্ছে রকেট উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্র, স্যাটেলাইট উৎপাদনশিল্প এবং অ্যাসেম্বলি, ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড টেস্ট ল্যাবরেটরি এবং স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণ। মূলত এর মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে মহাকাশ সক্ষমতা অর্জন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিশ্বে মহাকাশ বিজ্ঞানে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করার সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হবে। স্পারসোর বিজ্ঞানীরা জানান, এখন বিশ্বে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার রকেট উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। যদি প্রতি ইউনিটে এক লাখ ডলার আয় করা যায় তাহলে প্রতি হাজারে বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভবনা আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্পেস পোর্ট রাখলে দেশীয় বা অন্য দেশের রকেট থেকে বছরে বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। স্পারসোর সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শরীফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশাসহ পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা এটি জমা দিতে আরও দুই মাস সময় বাড়িয়ে নিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নিয়ে এখনো কাজ চলছে। মেট্রোরেল এবং আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে প্রতিষ্ঠানটির। যেহেতু মহাকাশ খাতটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই নতুন এজন্য মহাকাশ গবেষণায় অভিজ্ঞ যুুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ড. আতিকুজ্জামান এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

জানা যায়, এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশনের জন্য দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালীর সমুদ্রপারে রকেট উৎক্ষেপণের স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর স্যাটেলাইট কারখানার জন্য শরীয়তপুর, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে জরিপকাজ চলছে। এই জরিপ শেষে স্পারসো সরকারকে স্থান নির্বাচনের জন্য কয়েকটি বিকল্প দেবে। সরকার এরপর বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণ করবে। এই হিসেবে শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, গাজীপুর, খুলনার মতো কয়েকটি বেল্টে স্পারসো সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। স্পারসোর কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া নিজের দেশে রকেট তৈরি করলেও উৎপেক্ষণের জন্য কাজাখস্থানে চলে আসে। কারণ বিষুবরেখা বরাবর যদি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয় তাহলে খরচ অনেক কমে যায়। এখানে পৃথিবীর বেগ বেশি থাকে। আবার ইউরোপের অনেক দেশের রকেট উৎক্ষেপণের সুবিধাদি থাকলেও তারা ভারতে এসে ব্যয় কমাতে রকেট উৎক্ষেপণ করে। একইভাবে ফ্রান্স চলে যায় আফ্রিকাতে। বাংলাদেশে রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশন তৈরি করা হলে অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের স্টেশন ব্যবহার করতে পারবে। কারণ বাংলাদেশ বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত। এজন্য রকেট উৎক্ষেপণে জ্বালানি খরচ অনেক কমে যাবে। সব মিলে বাংলাদেশের রকেট উৎক্ষেপণ খাতের সম্ভাবনাও বেশি। আবার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থাকায় সুবিধাও হবে। পটুয়াখালীও বেল্ট হিসেবে ভালো স্থান। স্পারসোর সদস্য (প্রযুক্তি) ড. মো. মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি রকেট উৎক্ষেপণের জন্য প্রকল্প সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। সরকার যদি এগুলো বাস্তবায়নে যায় তাহলে মহাকাশ খাতে গতি ফিরবে। এ ছাড়া ভালো রেজল্যুশনের একটি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের জন্য কাজ চলমান আছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রকিউরমেন্টে যাওয়া হবে বলে আশা করছি।’ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল কন্তি দে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের রকেট ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশ্বাস দিয়েছেন দেশের স্বার্থে মহাকাশ গবেষণার উন্নয়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পাঠানো প্রকল্পের মধ্যে রকেট উৎক্ষেপণ, স্যাটেলাইট বানানো এবং স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করার মতো কাজগুলো আছে, যা একটি দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা করে থাকে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights