সংস্কৃতির প্রয়োজন সামঞ্জস্য, বিভ্রান্তি নয়

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় কখনোই বিচ্ছিন্নতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এটি গড়ে উঠেছে উন্মুক্ততা, সংলাপ এবং শৈল্পিক আদান-প্রদানের এক গভীর ঐতিহ্যের মাধ্যমে। ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ। তাই আমরা জানি, সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়; বরং এটি জাতীয় পরিচয়ের এক অপরিহার্য অংশ।

এ কারণেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক বিবেচনা, স্বচ্ছতা এবং সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। ঢাকায় ভারতীয় গায়ক-গীতিকার অনুপম রায়ের কনসার্টকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই বিষয়টি আবারও জনসমক্ষে আলোচনায় এনেছে।

‘ওয়ান ট্রু সাউন্ড উইথ অনুপম রায়’ শীর্ষক কনসার্টটি মূলত গত ২৬ জুন রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, আয়োজকরা প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন এবং ‘অনিবার্য পরিস্থিতির’ কারণে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার আগে তারা প্রয়োজনীয় অনুমোদনও পেয়েছিলেন। পরে কনসার্টটি ১ আগস্টের জন্য পুনঃনির্ধারিত হয়।

কিন্তু, অনুষ্ঠানটির মাত্র দুই দিন আগে এর অনুমতি আবারও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই ঘটনা অনেক ভক্তকে আবারও হতাশ করেছে। অনেক সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে এটি শুধু একটি কনসার্টের বিষয় না। বরং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে সে সম্পর্কে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

প্রায় একই সময়ে, ঢাকায় পাকিস্তানি গায়ক আতিফ আসলামের কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। পরে খবর আসে যে আয়োজকরা পূর্বানুমতি ছাড়াই অনুমোদিত স্থান পরিবর্তন করেছিলেন। যার ফলে বিষয়টি সরকারি তদন্তের আওতায় আসে এবং আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

দুটি ঘটনা হুবহু এক না। পেছনের কারণগুলো একই ছিল বলে ধরে নেওয়াটাও অনুচিত হবে। নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এবং নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়ে সরকারের আইনসম্মত দায়িত্ব রয়েছে। এ নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করে না।

তবে, যখন দুটি বড় আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভিন্ন ব্যবস্থাপনা পায় তখন জনগণ স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতার দাবি তুলবে। প্রশ্নটি এমন নয় যে একজন শিল্পী অনুষ্ঠান করবেন আর অন্যজন কেন করতে পারবেন না। প্রশ্নটি হলো, একই মানদণ্ড ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।

এ ধরনের বিষয়ে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। প্রশাসনিক, আইনি বা নিরাপত্তাজনিত কারণে কোনো অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল করা হলে তার কারণগুলো স্পষ্টভাবে এবং আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া উচিত। আয়োজকরা যদি নিয়মকানুন মেনে চলতে ব্যর্থ হন তবে শিল্পীর জাতীয়তা বা জনপ্রিয়তা নির্বিশেষে সেই নিয়মগুলো সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বের শিল্প প্রাঙ্গণে নষ্ট হতে পারে। তাদের কাছে আমাদের নীতি একচোখা লাগতে পারে।

বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্যে অনন্য সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই আলোচনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই বাংলার এই সংযোগের মূলে রয়েছে শত শত বছরের অভিন্ন ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান সীমান্তের দুই পারেই সমাদৃত। কাজী নজরুল ইসলাম একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে আছেন। লালন শাহের লোক ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। সমসাময়িক সংগীতশিল্পী, লেখক এবং শিল্পীরা নিয়মিতভাবে সীমানা পেরিয়ে দর্শক খুঁজে পান। কারণ সংস্কৃতি প্রায়শই মানুষকে এমনভাবে সংযুক্ত করে যা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক পারে না।

বাংলাদেশে অনুপম রায়ের জনপ্রিয়তা এই অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরেরই প্রতিফলন। তার জাতীয়তার কারণে নয় বরং একটি অভিন্ন ভাষা এবং আবেগঘন সংযোগের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কারণেই সমাদৃত হয় তার গান।

এই একই নীতি প্রতিটি দেশের শিল্পীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে পরিবর্তনশীল ধারণা বা বাছাই করা মানদণ্ড দিয়ে নয় বরং স্বচ্ছ নিয়মের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত।

বাংলাদেশের একটি গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এর ইতিহাস প্রমাণ করে যে ভাষা, সাহিত্য এবং শৈল্পিক অভিব্যক্তি এর জাতীয় চরিত্রের কেন্দ্রবিন্দু।

একটি আত্মবিশ্বাসী জাতিকে তার পরিচয় রক্ষার জন্য সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন হয় না। বরং, ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মকানুন বজায় রেখে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ওই জাতি নিজেকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

বাংলাদেশ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করছে তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা জোরদার করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে এটি নিশ্চিত করা যে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো এমন সুস্পষ্ট কার্যপ্রণালী দ্বারা পরিচালিত হয় যা জনগণ বোঝে এবং সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।

সংস্কৃতি বরাবরই বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি। এটি সীমানার ওপারে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করেছে। অনিশ্চয়তা বা অসঙ্গতিপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সেই সেতুগুলো যেন দুর্বল না হয়ে পড়ে।

যে জাতি নিজের সংস্কৃতিতে আত্মবিশ্বাসী, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান থেকে তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সংস্কৃতির উচিত সেতুবন্ধন তৈরি করা, বিভ্রান্তি নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights